প্রশ্ন: ৪০৭ : নফস এর অর্থ ও প্রকার ভেদ ।

 এক কথায়, রূহ হচ্ছে, জীবনী শক্তি ও বিবেকের সমন্বয়। 

আর নফস হচ্ছে, আপনার প্রবৃত্তি, চাহিদা, আপনার আমিত্ব  এর সমন্বয়। 

কুরআনে কয়েক ধরণের নফস এর কথা বলা হয়েছে, যেমন : 


(১) নফসে আম্মারা
(২) নফসে লাওয়ামা
(৩) নফসে মুৎমায়েন্না



১) নফসে আম্মারা :
সুরা ইউসুফ এর ৫৩ নং আয়াত :

﴿وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي ۚ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾
৫৩) আমি নিজের নফ্‌সকে দোষমুক্ত করছি না৷ নফ্‌স তো খারাপ কাজ করতে প্ররোচিত করে, তবে যদি কারোর প্রতি আমার রবের অনুগ্রহ হয় সে ছাড়া৷ অবশ্যি আমার রব বড়ই ক্ষমাশীল ও মেহেরবান৷”  


২। নফসে লাওয়ামা :
সুরা কিয়ামাহ এর ২ নং আয়াত :

﴿وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ﴾
২) আর না, আমি শপথ করছি তিরস্কারকারী নফসের৷ ২  
২ . কুরআন মজীদে মানুষের নফসের তিনটি রূপ উল্লেখ করা হয়েছে৷এক,একটি "নফস"মানুষকে মন্দ কাজে প্ররোচিত করে৷ এটির নাম "নফসে আম্মারা"৷ দুই, একটি "নফস" ভুল বা অন্যায় কাজ করলে অথবা ভুল বা অন্যায় বিষয়ে চিন্তা করলে কিংবা খারাপ নিয়ত রাখলে লজ্জিত হয় এবং সেজন্য মানুষকে তিরস্কার ও ভৎর্সনা করে৷ এটির নাম "নফসে লাউয়ামাহ"৷ আধুনিক পরিভাষায় একেই আমরা বিবেক বলে থাকি৷ তিন, যে নফসটি সঠিক পথে চললে এবং ভূল ও অন্যায়ের পথ পরিত্যাগ করলে তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে তাকে বলে "নফসে মুত্মাইন্নাহা"৷

এ আয়াতে আল্লাহ তা"আলা কি কারণে কিয়ামতের দিন এবং তিরস্কারকারী নফসের কসম করেছেন তা বর্ণনা করেননি৷কারণ পরবর্তী আয়াতটি সে বিষয়টির প্রতিই ইংগিত করছে৷ যে জন্য কসম করা হয়েছে তাহলো, মানুষের মরার পর আল্লাহ তা"আলা পুনরায় তাকে অবশ্যই সৃষ্টি করবেন৷ তা করতে তিনি পুরোপুরি সক্ষম৷ এখন প্রশ্ন হলো এ বিষয়টির জন্য এ দুটি জিনিসের কসম করার পেছনে কি যৌক্তিকতা আছে?

কিয়ামতের দিনের কসম খাওয়ার কারণ হলো, কিয়ামতের আগমন নিশ্চিত ও অনিবার্য৷ গোটা বিশ্ব-জাহানের ব্যবস্থাপনাই প্রমাণ করছে যে, এ ব্যবস্থাপনা অনাদী ও অন্তহীন নয়৷ এর বৈশিষ্ট ও প্রকৃতিই বলে দিচ্ছে এটা চিরদিন ছিল না এবং চিরদিন থাকতে ও পারে না৷ মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি এ ভিত্তিহীন ধ্যান-ধারণার সপক্ষে ইতিপূর্বেও কোন মজবুত দলীল-প্রমান খুঁজে পায়নি যে, প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল এ পৃথিবী কখনো অনাদি ও অবিনশ্বর হতে পারে৷ কিন্তু এ পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান যতই বৃদ্ধি পেতে থাকে এ বিষয়টি তার কাছে ততই নিশ্চিত হতে থাকে যে, এ চাঞ্চল্য মুখর বিশ্ব-জাহানের একটি শুরু বা সূচনা বিন্দু আছে যার পূর্বে এটি ছিল না৷ আবার অনিবার্যরূপে এর একটি শেষও আছে যার পরে এটি আর থাকবে না৷ এ কারণে আল্লাহ তা"আলা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে কিয়ামতেরই কসম করেছেন ৷ এ কসমটির ধরন এরূপ যেমন আমরা অতিশয় সন্দেহবাদী কোন মানুষকে -যে তার আপন অস্তিত্ব সম্পর্কেও সন্দেহ করছে- সম্বোধন করে বলিঃ তোমার প্রাণ সত্তার কসম, তুমি তো বর্তমান৷ অর্থাৎ তোমার অস্তিত্বই সাক্ষী যে তুমি আছ৷

কিয়ামতের দিনের কসম শুধু এ বিষয়টি প্রমাণ করে যে, একদিন বিশ্ব -জাহানের এ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে৷ এরপর মানুষকে পুনরায় জীবিত করে উঠানো হবে৷ তাকে নিজের সমস্ত কাজের হিসেবে দিতে হবে এবং সে নিজের কৃতকর্মের ভাল বা মন্দ ফলাফল দেখবে৷ এর জন্য পুনরায় "নফসের লাউয়ামাহ" কসম করা হয়েছে৷ পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যার মধ্যে বিবেক বলে কোন জিনিস নেই৷এ বিবেকের মধ্যে অনিবার্যরূপে ভাল এবং মন্দের একটি অনুভূমি বিদ্যমান ৷ মানুষ ভাল এবং মন্দ যাচায়ের যে মানদণ্ডই স্থির করে থাকুক না কেন এবং তা ভুল হোক ব নির্ভুল হোক, চরম অধঃপতিত ও বিভ্রান্ত মানুষের বিবেকও মন্দ কাজ করলে কিংবা ভাল কাজ না করলে তাকে তিরষ্কার করে৷ এটিই প্রমান করে যে, মানুষ নিছক একটি জীব নয়, বরং একটি নৈতিক সত্ত্বাও বটে ৷ প্রকৃতিগতভাবেই তার মধ্যে ভাল এবং মন্দের উপলদ্ধি বিদ্যমান৷ সে নিজেই ভাল এবং মন্দ কাজের জন্য নিজেকে দায়ী মনে করে৷ সে অন্যের সাথে যখন কোন খারাপ আচরণ করে তখন সে ব্যাপারে নিজের বিবেকের দংশনকে দমন করে আত্মতৃপ্তি লাভ করলেও অন্য কেউ যখন তার সাথে একই আচরণ করে তখন আপনা থেকেই তার বিবেক দাবী করে যে, এ ধরনের আচরণকারীর শাস্তি হওয়া উচিত৷ এখন কথা হলো, মানুষের নিজ সত্তার মধ্যেই যদি এ ধরনের একটি "নফসে লাউয়ামাহ" বা তিরষ্কারকারী বিবেকের উপস্থিতি একটি অনস্বীকার্য সত্য হয়ে থাকে , তাহলে এ সত্যটিও অনস্বীকার্য যে,এ "নফসে লাউয়ামা"ই মৃত্যুর পরের জীবনের এমন একটি প্রমাণ যা মানুষের আপন সত্তার মধ্যে বিদ্যমান৷ কেননা যেসব ভাল এবং মন্দ কাজের জন্য মানুষ দায়ী সেসব কাজের পুরষ্কার বা শান্তি তার অবশ্যই পাওয়া উচিত৷এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক দাবী৷ কিন্তু মৃত্যুর পরের জীবন জীবন ছাড়া আর কোনভাবেই তার এ দাবী পূরণ হতে পারে না৷ মৃত্যুর পরে মানুষের সত্তা যদি বিলীন ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তাহলে তার অনেক ভাল কাজের পুরস্কার থেকে সে নিশ্চিতরূপে বঞ্চিত থেকে যাবে ৷ আবার এমন অনেক মন্দ কাজ আছে যার ন্যায্য শাস্তি থেকে সে অবশ্যই নিস্কৃতি পেয়ে যাবে৷ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন কোন মানুষই এ সত্য অস্বীকার করতে পারে না৷ অযৌক্তিক একটি বিশ্বে বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ জন্মলাভ করে বসেছে এবং নৈতিক উপলদ্ধি সম্পন্ন মানুষ এমন এ পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে বসেছে মৌলিকভাবে যার পুরা ব্যবস্থাপনায় নৈতিকতার কোন অস্তিত্বই নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ এ অর্থহীন ও অযৌক্তিক কথাটি স্বীকার না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে মৃত্যুর পরের জীবনকে অস্বীকার করতে পারে না৷ একইভাবে পুনর্জন্ম বা জন্মান্তরবাদী দর্শন প্রকৃতির এ দাবীর যথার্থ জবাব নয়৷ কারণ মানুষ যদি নিজের নৈতিক কাজ-কর্মের পুরষ্কার ব শাস্তিলাভের জন্য একের পর এক এ কাজ-কর্ম করতে থাকবে যা নতুন করে পুরষ্কার বা শাস্তি দাবী করবে৷ আর এ অন্তহীন ধারাবাহিকতার ঘুর্ণিপাকে পরে তার হিসেব -নিকেশের কোন ফায়সালা হবে না৷ বরং তা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে৷ সুতরাং প্রকৃতির এ দাবী কেবল একটি অব্স্থায়ই পূরণ হতে পারে ৷তাহলো, এ পৃথিবীতে মানুষের একটি মাত্র জীবন হবে এবং গোটা মানব জাতির আগমতের ধারা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আরেকটি জীবন হবে সে জীবনে মানুষের সমস্ত কাজকর্ম যথাযথভাবে হিসেব-নিকেশ করে তাকে তার প্রাপ্য পুরো পুরস্কার বা শস্তি দেয়া হবে৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কোরআন, আল আ"রাফ ,টীকা ৩০)৷





৩। নফস মুৎমায়েন্না :

সুরা আল ফজরের ২৭-৩০ নং আয়াত :

﴿يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ﴾
২৭) ( অন্য দিকে বলা হবে ) হে প্রশান্ত আত্মা !১৮ 
১৮. 'প্রশান্ত আত্মা ' বলে এমন মানুষকে বুঝানো হয়েছে যে, কোন প্রকার সন্দেহ সংশয় ছাড়াই পূর্ণ নিশ্চিন্ততা সহকারে ঠাণ্ডা মাথায় এক ও লা -শরীক আল্লাহকে নিজের রব এবং নবীগণ যে সত্য দীন এনেছিলেন তাকে নিজের দীন ও জীবন বিধান হিসেবে গণ্য করেছে৷ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কাছে থেকে যে বিশ্বাস ও বিধানই পাওয়া গেছে তাকে সে পুরোপুরি সত্য বলে মেনে নিয়েছে৷ আল্লাহর দীন যে জিনিসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে তাকে সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নয় বরং এই বিশ্বাস সহকারে বর্জন করেছে যে , সত্যিই তা খারাপ৷ সত্য প্রীতির পথে যে কোন ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে সে নির্দ্ধিধায় তা করেছে৷ এই পথে যেসব সংকট , সমস্যা , কষ্ট ও বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে হাসি মুখে সেগুলো বরদাশত করেছে৷ অন্যায় পথে চলে লোকদের দুনিয়ায় নানান ধরনের স্বার্থ , ঐশ্বর্য ও সুখ - সম্ভার লাভ করার যেসব দৃশ্য সে দেখছে তা থেকে বঞ্চিত থাকার জন্য তার নিজের মধ্যে কোন ক্ষোভ বা আক্ষেপ জাগেনি৷ বরং সত্য দীন অনুসরণ করার ফলে সে যে এই সমস্ত আবর্জনা থেকে মুক্ত থেকেছে , এজন্য সে নিজের মধ্যে পূর্ণ নিশ্চিন্ততা অনুভব করেছে৷ কুরআনের অন্যত্র এই অবস্থাটিকে ' শারহে সদয় ' বা হৃদয় উন্মুক্ত করে দেয়া অর্থে বর্ণনা করা হয়েছে৷ ( আল আন' আম , ১২৫ )
﴿ارْجِعِي إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً﴾
২৮) চলো তোমার রবের দিকে , ১৯ এমন অবস্থায় যে তুমি ( নিজের শুভ পরিণতিতে ) সন্তুষ্ট ( এবং তোমরা রবের প্রিয়পাত্র৷  
১৯. একথা তাকে মৃত্যুকালে ও বলা হবে , যখন কিয়ামতের দিন পুনরায় জীবিত হয়ে হাশরের ময়দানের দিকে যেতে থাকবে সে সময়ও বলা হবে এবং আল্লাহর আদালতে পেশ করার সময় ও তাকে একথা বলা হবে৷ প্রতিটি পর্যাযে তাকে এই মর্মে নিশ্চয়তা দান করা হবে যে , সে আল্লাহর রহমতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে৷
﴿فَادْخُلِي فِي عِبَادِي﴾
২৯) শামিল হয়ে যাও আমার ( নেক ) বান্দাদের মধ্যে  
﴿وَادْخُلِي جَنَّتِي﴾
৩০) এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে৷  






==================================


এছাড়াও নফস সম্পর্কে আরো বিস্তারিত : সুরা আশ শামস এর ৭ - ১০ নং আয়াত :

﴿وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا﴾
৭) মানুসের নফসের ও সেই সত্তার কসম যিনি তাকে ঠিকভাবে গঠন করেছেন৷৪  
৪ . 'ঠিকভাবে গঠন করেছেন ' মানে হচ্ছে , তাকে এমন একটি দেহ দান করেছেন , যা তার সুডৌল গঠনাকৃতি , হাত - পা ও মস্তিস্ক সংযোজনের দিক থেকে মানবিক জীবন যাপন করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী ছিল৷ তাকে দেখার , শুনার , স্পর্শ করার , স্বাদ গ্রহণ করার ও ঘ্রাণ নেবার জন্য এমন ইন্দ্রিয় দান করেছেন যা তার বৈশিষ্ট ও আনুপাতিক কর্মক্ষমতার দিক দিয়ে তার জন্য জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে ভালো উপায় হতে পারতো ৷ তাকে চিন্তা ও বুদ্ধি শক্তি , যুক্তি উপস্থাপন ও প্রমাণ পেশ করার শক্তি , কল্পনা শক্তি , স্মৃতি শক্তি , পার্থক্য করার শক্তি , সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার শক্তি , সংকল্প শক্তি এবং এমন অনেক মানসিক শক্তি দান করেছেন যার ফলে সে এই দুনিয়ায় মানুষের মতো কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেছে৷ এছাড়া "ঠিকভাবে গঠন করার " মধ্যে এ অর্থও রয়েছে যে , তাকে জন্মগত পাপী ও প্রকৃতিগত বদমায়েশ হিসেবে তৈরি না করে বরং সহজ সরল প্রকৃতির ভিত্তিতে সৃষ্টি করেছেন৷ তার গঠনাকৃতিতে এমন ধরনের কোন বক্রতা রেখে দেননি যা তাকে সোজাপথ অবলম্বন করতে চাইলেও করতে দিতো না ৷ একথাটিকেই সূরা রূমে নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে : আরবী -------------------------------------------------------------------------------------" সেই প্রকৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও যার ওপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন৷ " ( ২০ আয়াত ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম এ কথাটিকেই একটি হাদীসে এভাবে বর্ণনা করেছেন : এমন কোন শিশু নেই যে প্রকৃতি ছাড়া অন্যকিছুর ওপর পয়দা হয়৷ তারপর মা- বাপ তাকে ইহুদি , খৃষ্টান বা অগ্নি উপাসক বানায়৷ এটা তেমনি যেমন পশুর পেট থেকে সুস্থ , সবল ও পূর্ণ অবয়ব বিশিষ্ট বাচ্চা পয়দা হয়৷ তোমরা কি তাদের কাউকে কানকাটা পেয়েছো ? ( বুখারী ও মুসলিম ) অর্থাৎ পরবর্তী কালে মুশরিকরা তাদের জাহেলী কুসংস্কারের কারণে পশুদের কান কেটে দেয়৷ নয়তো আল্লাহ কোন পশুকে তার মায়ের পেট থেকে কানকাটা অবস্থায় পয়দা করেননি৷ অন্য একটি হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : " আমার রব বলেন , আমার সকল বান্দাকে আমি হানীফ ( সঠিক প্রকৃতির উপর ) সৃষ্টি করেছিলাম৷ তারপর শয়তানরা এসে তাদেরকে তাদের দীন ( অর্থাৎ তাদের প্রাকৃতিক দীন) থেকে সরিয়ে দিয়েছে এবং তাদের ওপর এমন সব জিনিস হারাম করে দিয়েছে যা আমি তাদের জন্য হালাল করে দিয়েছিলাম৷ শয়তানরা আমার সাথে তাদেরকে শরীক করার জন্য তাদেরকে হুকুম দিয়েছে , অথচ আমার সাথে তাদের শরীক হবার ব্যাপারে আমি কোন প্রমাণ নাযিল করিনি৷ " ( মুসনাদে আহমাদ , ইমাম মুসলিম ও প্রায় একই রকম শব্দ সহকারে এ হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন)
﴿فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا﴾
৮) তারপর তার পাপ ও তার তাকওয়া তার প্রতি ইলহাম করেছেন৷৫  
৫ . ইলহাম শব্দটির উৎপত্তি লহম ( আরবী ) থেকে৷ এর মানে গিলে ফেলা৷ যেমন বলা হয় ( আরবী------------) উমুক ব্যক্তি জিনিসটিকে দিলে ফেলেছে৷ আর ( আরবী ------) মানে হয় , আমি উমুক জিনিসটি তাকে গিলিয়ে দিয়েছি বা তার গলায় নীচে নামিয়ে দিয়েছি ৷ এই মৌলিক অর্থের দিক দিয়ে ইলহাম শব্দ পারিভাষিক অর্থে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন কল্পনা বা চিন্তাকে অবচেতনভাবে বান্দার মন ও মস্তিষ্কের গোপন প্রদেশে নামিয়ে দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়৷ মানুষের প্রতি তার পাপ এবং তার নেকী ও তাকওয়া ইলহাম করে দেয়ার দু'টি অর্থ হয়৷ এক, স্রষ্টা তার মধ্যে নেকী ও গোনাহ উভয়ের ঝোঁক প্রবণতা রেখে দিয়েছেন৷ প্রত্যেক ব্যক্তিই এটি অনুভব করে৷ দুই , প্রত্যেক ব্যক্তির অবচেতন মনে আল্লাহ এ চিন্তাটি রেখে দিয়েছেন যে , নৈতিকতার ক্ষেত্রে কোন জিনিস ভালো ও কোন জিনিস মন্দ এবং সৎ নৈতিক বৃত্তি ও সৎকাজ এবং অসৎ নৈতিক বৃত্তি ও অসৎকাজ সমান নয়৷ ফুজুর ( দুস্কৃতি ও পাপ ) একটি খারাপ জিনিস এবং তাকওয়া ( খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা ) একটি ভালো জিনিস , এ চিন্তাধারা মানুষের জন্য নতুন নয়৷ বরং তার প্রকৃতি এগুলোর সাথে পরিচিত৷ স্রষ্টা তার মধ্যে জন্মগতভাবে ভালো ও মন্দের পার্থক্যবোধ সৃষ্টি করে দিয়েছেন৷ একথাটিই সূরা আল বালাদে এভাবে বলা হয়েছে : আরবী -------------------------------------------------------------------- " আর আমি ভালো ও মন্দ উভয় পথ তার জন্য সুম্পষ্ট করে রেখে দিয়েছি৷" ( ১০ আয়াত ) সূরা আদদাহরে নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে : আরবী -------------------- " আমি তাদেরকে পথ দেখিয়ে দিয়েছি , চাইলে তার কৃতজ্ঞ হতে পারে আবার চাইলে হতে পারে অস্বীকারকারী৷ " ( ৩ আয়াত ) একথাটিই সূরা আল কিয়ামাহে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে : মানুষের মধ্যে একটি নফসে লাওয়ামাহ ( বিবেক ) আছে৷ সে অসৎকাজ করলে তাকে তিরস্কার করে৷ (২ আয়াত ) আর প্রত্যেক ব্যক্তি সে যতই ওজর পেশ করুক না কেন সে কি তা সে খুব ভালো করেই জানে৷ ( ১৪- ১৫ আয়াত )

এখানে একথাটি ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে যে , মহান আল্লাহ স্বভাবজাত ও প্রকৃতিগত ইলহাম করেছেন প্রত্যেক সৃষ্টির প্রতি তার মর্যাদা ভুমিকা ও স্বরূপ অনুযায়ী৷ যেমন সূরা ত্বা - হা'য় বলা হয়েছে : আরবী ------------------------------------------------------------------------ " যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে তার আকৃতি দান করেছেন , তারপর তাকে পথ দেখিয়েছেন ৷ " ( ৫০ আয়াত ) যেমন প্রাণীদের প্রত্যেক প্রজাতিকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ইলহামী জ্ঞান দান করা হয়েছে৷ যার ফলে মাছ নিজে নিজেই সাঁতার কাটে৷ পাখি উড়ে বেড়ায় ৷ মৌমাছি মৌচাক তৈরি করে৷ চাতক বাসা বানায় ৷ মানুষকেই তার বিভিন্ন পর্যায় ও ভূমিকার ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক ইলহামী জ্ঞান দান করা হয়েছে৷ মানুষ এক দিক দিয়ে প্রাণী গোষ্ঠীভুক্ত৷ এই দিক দিয়ে তাকে যে ইলহামী জ্ঞান দান করা হয়েছে তার একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে , মানব শিশু জন্মের সাথে সাথেই মায়ের স্তন চুষতে থাকে৷ আল্লাহ যদি প্রকৃতিগতভাবে তাকে এ শিক্ষাটি না দিতেন তাহলে তাকে এ কৌশলটি শিক্ষা দেবার সাধ্য কারো ছিল না৷ অন্যদিক দিয়ে মানুষ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী৷ এদিক দিয়ে তার সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ তাকে অনবরত ইলহামী পথনির্দেশনা দিয়ে চলছেন৷ এর ফলে সে একের পর এক উদ্ভাবন ও আবিস্কারের মাধ্যমে মানব সভ্যতার বিকাশ সাধন করছে৷এই সমস্ত উদ্ভাবন ও আবিস্কারের ইতিহাস অধ্যয়নকারী যে কোন ব্যক্তিই একথা অনুভব করবেন যে,সম্ভবত মানুষের চিন্তা ও পরিশ্রমের ফল হিসেবে দু' একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রত্যেকটি আবিস্কার আকস্মিকভাবে শুরু হয়েছে৷হঠাৎ এক ব্যক্তির মাথার একটি চিন্তার উদয় হয়েছে এবং তারই ভিত্তিতে সে কোন জিনিস আবিস্কার করেছে৷ এই দু'টি মর্যাদা ছাড়াও মানুষের আর একটি মর্যাদা ও ভূমিকা আছে৷ সে একটি নৈতিক জীবও৷ এই পর্যায়ে আল্লাহ তাকে ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার শক্তি এবং ভালোকে ভালো ও মন্দকে মন্দ জানার অনুভূতি ইলহাম করেছেন৷এই শক্তি, বোধ ও অনুভূতি একটি বিশ্বজনীন সত্য৷ এর ফলে আজ পর্যন্ত দুনিয়ায় এমন কোন সমাজসভ্যতা গড়ে ওঠেনি যেখানে ভালো ও মন্দের ধারণা ও চিন্তা কার্যকর ছিল না৷ আর এমন কোন সমাজ ইতিহাসে কোন দিন পাওয়া যায়নি এবং আজো পাওয়া না যেখানকার ব্যবস্থায় ভালো ও মন্দের এবং সৎ ও অসৎকর্মের জন্য পুরস্কার ও শাস্তির কোন না কোন পদ্ধতি অবলম্বিত হয়নি৷ প্রতিযুগে,প্রত্যেক জায়গায় এবং সভ্যতা - সংস্কৃতির প্রত্যেক পর্যায়ে এই জিনিসটির অস্তিত্বই এর স্বভাবজাত ও প্রকৃতিগত হবার সুস্পষ্ট প্রমাণ৷এছাড়াও একজন বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ স্রষ্টা মানুষের প্রকৃতির মধ্যেই এটি গচ্ছিত রেখেছেন, একথাও এ থেকে প্রমানিত হয়৷ কারণ যেসব উপাদানে মানুষ তৈরি এবং যেসব আইন ও নিয়মের মাধ্যমে জড় জগত চলছে তার কোথাও নৈতিকতার কোন একটি বিষয়ও চিহ্নিত করা যাবে না৷

﴿قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا﴾
৯) নিসন্দেহে সফল হয়ে গেছে সেই ব্যক্তির নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে  
﴿وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا﴾
১০) এবং যে তাকে দাবিয়ে দিয়েছে সে ব্যর্থ হয়েছে৷৬  
৬ . একথাটির ওপরই ওপরের আয়াগুলোতে বিভিন্ন জিনিসের কসম খাওয়া হয়েছে৷ ওই জিনিসগুলো থেকে একথাটি কিভাবে প্রমাণ হয় তা এখন চিন্তা করে দেখুন৷ যেসব গভীর তত্ব আল্লাহ মানুকে বুঝাতে চান সেগুলো সম্পর্কে তিনি কুরআনে যে বিশেষ নিয়ম অবলম্বন করেছেন তা হচ্ছে এই যে, সেগুলো প্রমাণ করার জন্য তিনি হাতের কাছের এমন কিছু সুম্পষ্ট ও সর্বজন পরিচিত জিনিস পেশ করেন, যা প্রত্যেক ব্যক্তি তার আশেপাশে অথবা নিজের অস্তিত্বের মধ্যে প্রতিদিন ও প্রতি মুহূর্তে দেখে৷এই নিয়ম অনুযায়ী এখানে এক এক জোড়া জিনিস নিয়ে তাদেরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে পেশ করা হয়েছে৷ তারা পরস্পরের বিপরীতধর্মী কাজেই তাদের প্রভাব ও ফলাফলও সমান নয়৷ বরং অনিবার্যভাবে তারা পরস্পর বিভিন্ন৷ একদিকে সূর্য,অন্যদিকে চাঁদ৷সূর্যের আলো অত্যন্ত প্রখর৷এর মধ্যে রয়েছে তাপ৷ এর তুলনায় চাঁদের নিজের কোন আলো নেই৷ সূর্যের উপস্থিতিতে সে আকাশে থাকলেও আলোহীন থাকে৷ সূর্য ডুবে যাবার পর সে উজ্জ্বল হয়৷ সে সময়ও তার আলোর মধ্যে রাতকে দিন বানিয়ে দেবার ঔজ্জ্বল্য থাকে না৷ সূর্য তার আলোর প্রখরতা দিয়ে দুনিয়ায় যে কাজ করে চাঁদের আলোর মধ্যে সে প্রখরতা থাকে না৷ তবে তার নিজস্ব কিছু প্রভাব রয়েছে৷ এগুলো সূর্যের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির৷ এভাবে একদিকে আছে দিন এবং অন্যদিকে রাত৷ এরা পরস্পরের বিপরীতধর্মী৷ উভয়ের প্রভাব ও ফলাফল এত বেশী বিভিন্ন যে, এদেরকে কেউ একসাথে জমা করতে পারে না৷ এমন কি সবচেয়ে নিবোর্ধ ব্যক্তিটির পক্ষেও একথা বলা সম্ভব হয় না যে, রাত হলেই বা কি আর দিন হলেই বা কি, এতে কোন পার্থক্য হয় না৷ ঠিক তেমনি একদিকে রয়েছে আকাশ৷ স্রষ্টা তাকে উঁচুতে স্থাপন করেছেন৷ অন্যদিকে রয়েছে পৃথিবী৷ এর স্রষ্টা একে আকাশের তলায় বিছানার মতো করে বিছিয়ে দিয়েছেন৷ এরা উভয়েই একই বিশ্ব জাহানের ও তার ব্যবস্থার সেবা করছে এবং তার প্রয়োজন পূর্ণ করছে৷ কিন্তু উভয়ের কাজ এবং প্রভাব ও ফলাফলের মধ্যে আসমান - যমীন ফারাক৷ উর্ধজগতের এই সাক্ষ প্রমাণগুলো পেশ করার পর মানুষের নিজের শরীর সম্পর্কে বলা হয়েছে,তার অংগ -প্রত্যংগ এবং ইন্দ্রিয় ও মস্তিস্কের শক্তিগুলোকে আনুপাতিক ও সমতাপূর্ণ মিশ্রণের মাধ্যমে সুগঠিত করে স্রষ্টা তার মধ্যে সৎ ও অসৎ প্রবনতা ও কার্যকারণসমূহ রেখে দিয়েছেন৷ এগুলো পরস্পরের বিপরীত ধর্মী ইলহামী তথা অবচেতনভাবে তাকে এদের উভয়ের পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছেন৷ তাকে জানিয়ে দিয়েছেন, এদের একটি হচ্ছে ফুজুর - দুষ্কৃতি,তা খারাপ এবং অন্যটি হচ্ছে,তাকওয়া - আল্লাহভীতি,তা ভালো৷এখন যদি সূর্য ও চন্দ্র, রাত ও দিন এবং আকাশ ও পৃথিবী এক না হয়ে থাকে বরং তাদের প্রভাব ও ফলাফল অনিবার্যভাবে পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে থাকে তাহলে,মানুষের নফসের দুস্কৃতি ও তাকওয়া পরস্পরের বিপরীতধর্মী হওয়া সত্ত্বেও এক হতে পারে কেমন করে ? মানুষ নিজেই এই দুনিয়ায় নেকী ও পাপকে এই মনে করে না৷ নিজের মনগড়া দর্শনের দৃষ্টিতে সে ভালো ও মন্দের কিছু মানদণ্ড তৈরি করে নিয়েই থাকে তাহলেও যে জিনিসটিকে সে নেকী মনে করে, সে সম্পর্কে তার অভিমত হচ্ছে এই যে,তা প্রশংসনীয় এবং প্রতিফল ও পুরস্কার লাভের যোগ্য৷ অন্যদিকে যাকে সে অসৎ ও গোনাহ মনে করে,সে সম্পর্কে তার নিজের নিরপেক্ষ অভিমত হচ্ছে এই যে,তা নিন্দনীয় ও শাস্তির যোগ্য৷ কিন্তু আসল ফায়সালা মানুষের হাতে নেই৷ বরং যে স্রষ্টা মানুষের প্রতি তার গোনাহ ও তাকওয়া ইলহাম করেছেন তার হাতেই রয়েছে এর ফায়সালা৷ স্রষ্টার দৃষ্টিতে যা গোনাহ ও দুষ্কৃতি আসলে তাই হচ্ছে গোনাহ ও দুষ্কৃতি এবং তাঁর দৃষ্টিতে যা তাকওয়া আসলে তাই হচ্ছে তাকওয়া৷ স্রষ্টার কাছে এ দু'টি রয়েছে পৃথক পরিণাম৷ একটির পরিণাম হচ্ছে, যে নিজের নফসের পরিশুদ্ধি করবে সে সাফল্য লাভ করবে এবং অন্যটির পরিণাম হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজের নফসকে দাবিয়ে দেবে সে ব্যর্থ হবে ৷

তাযাক্কা আরবী ------- পরিশুদ্ধ করা মানে পাক -পবিত্র করা, বিকশিত করা এবং উদ্বুদ্ধ ও উন্নত করা৷পূর্বাপর সম্পর্কের ভিত্তিতে এর পরিষ্কার অর্থ দাঁড়ায়, যে ব্যক্তি নিজের নফস ও প্রবৃত্তিকে দুষ্কৃতি থেকে পাক -পবিত্র করে, তাকে উদ্বুদ্ধ ও উন্নত করে তাক‌ওয়ার উচ্চতম পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং তার মধ্যে সৎপ্রবণতাকে বিকশিত করে, সে সাফল্য লাভ করবে৷ এর মোকাবেলায় দাসসাহা আরবী ------- শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷এর শব্দমূল হচ্ছে তাদসীয়া আরবী ------------- তাদসীয়া মানে হচ্ছে দাবিয়ে দেয়া, লুকিয়ে ফেলা ,ছিনিয়ে নেয়া,আত্মসাৎ করা ও পথভ্রষ্ট করা৷ পূর্বাপর সম্পর্কের ভিত্তিতে এর অর্থও এখানে সুস্পষ্ট হয়ে যায় অর্থাৎ সেই ব্যক্তি ব্যর্থ হবে,যে নিজের নফসের মধ্যে নেকী ও সৎকর্মের যে প্রবণতা পাওয়া যাচ্ছিল তাকে উদ্দীপিত ও বিকশিত করার পরিবর্তে দাবিয়ে দেয়, তাকে বিভ্রান্ত করে অসৎপ্রবণতার দিকে নিয়ে যায় এবং দুস্কৃতিকে তার ওপর এত বেশী প্রবল করে দেয়া যার ফলে তাকওয়া তার নীচে এমন ভাবে মুখ ঢাকে যেমন কোন লাশকে কবরের মধ্যে রেখে তার ওপর মাটি চাপা দিলে তা ঢেকে যায়৷ কোন কোন তাফসীরকার এই আয়াতের অর্থ বর্ণনা করে বলেছেন আরবী ------------------ অর্থাৎ যে ব্যক্তির নফসকে আল্লাহ পাক - পবিত্র করে দিয়েছেন সে সাফল্য লাভ করেছে এবং যার নফসকে আল্লাহ দাবিয়ে দিয়েছেন সে ব্যর্থ হয়ে গেছে৷ কিন্তু এ ব্যাখ্যাটি প্রথমত ভাষার দিক দিয়ে কুরআনের বর্ণনাভংগীর পরিপন্থী৷ কারণ আল্লাহর যদি একথা বলাই উদ্দেশ্য হতো তাহলে তিনি এভাবে বলতেন :আরবী ----------------------------------------------------------------------(যে নফসকে আল্লাহ পাক - পবিত্র করে দিয়েছেন সে সফল হয়ে গেছে এবং ব্যর্থ হয়ে গেছে সেই নফস যাকে আল্লাহ দাবিয়ে দিয়েছেন৷) দ্বিতীয়, এই ব্যাখ্যাটি এই বিষয়বস্তু সম্বলিত কুরআনের অন্যান্য বর্ণনার সাথে সংঘর্ষশীল৷ সূরা আ'লায় মহান আল্লাহ বলেছেন :আরবী ----------------------- (সফল হয়ে গেছে সেই ব্যক্তি যে পবিত্রতা করেছে - ৪ আয়াত ) সূরা 'আবাসায় মহান আল্লাহ রসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন :আরবী ------------------------------------------ "তোমাদের ওপর কি দায়িত্ব আছে যদি তারা পবিত্রতা অবলম্বন না করে ?এই দু'টি আয়াতে পবিত্রতা অবলম্বন করাকে বান্দার কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে৷এ ছাড়াও কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ সত্যটি বর্ণনা করা হয়েছে যে,এই দুনিয়ায় মানুষের পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে৷ যেমন সূরা দাহ্‌র - এ বলা হয়েছে :" আমি মানুষকে একটি মিশ্রিত শুক্র থেকে পয়দা করেছি, যাতে তাকে পরীক্ষা করতে পারি ,তাই তাকে আমি শোনার ও দেখার ক্ষমতা দিয়েছি৷" (২ আয়াত ) সূরা মূলকে হয়েছে :"তিনি মৃত্যু ও জীবন উদ্ভাবন করেছেন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করা যায় যে, তোমাদের মধ্যে কে ভালো কাজ করে৷"(২ আয়াত ) যখন একথা সুস্পষ্ট পরীক্ষা গ্রহণকারী যদি আগেভাগেই একজন পরীক্ষার্থীকে সামনে বাড়িয়ে দেয় এবং অন্যজনকে দাবিয়ে দেয় তাহলে আদতে পরীক্ষাই অর্থহীন হয়ে পড়ে৷ কাজেই কাতাদাহ , ইকরামা , মুজাহিদ ও সাঈদ ইবনে জুবাইর যা বলেছেন সেটিই হচ্ছে এর আসাল তাফসীর৷ তারা বলেছেন : যাক্কাহা ও দাসসাহা'র কর্তা হচ্ছে বান্দা , আল্লাহ নন৷ আর ইবনে আবী হাতেম জুওয়াইর ইবনে সাঈদ থেকে এবং তিনি যাহহাক থেকে এবং যাহহাক ইবনে আব্বাস ( রা) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন , যাতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই এই আয়াতের অর্থ বর্ণনা করে বলেছেন : আরবী --------------------------------------------------------------------- ( সফল হয়ে গেছে সেই ব্যক্তি যাকে মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ পবিত্র করে দিয়েছেন ) এই হাদীসটি সম্পর্কে বলা যায় , এখানে রসূলুল্লাহ (সা) এর যে উক্তি পেশ করা হয়েছে তা আসলে তাঁর থেকে প্রমাণিত নয়৷ কারণ এই সনদের রাবী জুওয়াইর একজন প্রত্যাখ্যাত রাবী৷ অন্যদিকে ইবনে আব্বাসের সাথে যাহহাকের সাক্ষাত হয়নি৷ তবে ইমাম আহমাদ , মুসলিম , নাসাঈ ও ইবনে আবী শাইবা হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম ( রা) থেকে যে রেওয়ায়াতটি করেছেন সেটি অবশ্যি একটি সহীহ হাদীস৷ তাতে বলা হয়েছে , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করতেন : আরবী ------------------------------------------------------------------------------------ "হে আল্লাহ !আমার নফসকে তার তাকওয়া দান করো এবং তাকে পবিত্র করো৷তাকে পবিত্র করার জন্যে তুমিই সর্বোত্তম সত্তা৷ তুমিই তার অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক৷' রসূলের প্রায় এই একই ধরনের দোয়া তাবারানী, ইবনে মারদুইয়া ও ইবনুল মুনযির হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে এবং ইমাম আহমাদ হযরত আয়েশা থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ মূলত এর অর্থ হচ্ছে,বান্দা কেবল তাকওয়া ও তাযকীয়া তথা পবিত্রতা অবলম্বন করার ইচ্ছাই প্রকাশ করতে পারে৷তবে তা তার ভাগ্যে যাওয়া আল্লাহর ইচ্ছা ও তাওফীকের ওপর নির্ভর করে৷তাদসীয়া তথা নফসকে দাবিয়ে দেবার ব্যাপারেও এই একই অবস্থা অর্থাৎ আল্লাহ জোর করে কোন নফসকে দাবিয়ে দেন না৷ কিন্তু বান্দা যখন এ ব্যাপারে একেবারে আদা - পানি খেয়ে লাগে তখন তাকে তাকওয়া ও তাযকীয়ার তাওফীক থেকে বঞ্চিত করেন এবং সে তার নফসকে যে ধরনের ময়লা আবর্জনার মধ্যে দাবিয়ে দিতে চায় তার মধ্যেই তাকে ছেড়ে দেন৷






প্রশ্ন: ৪০৬ : ওয়াদা ও কসম এর পার্থক্য এবং ভঙ্গ করার কাফফারা।

 কসম ও ওয়াদার মাঝে পার্থক্য:

১)  এখানে এ বিষয়টি খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে, ওয়াদা করা আর কসম খাওয়া এক জিনিস নয়। কেউ হয়ত মনে মনে বা কারো কাছে ওয়াদা করল যে, সে এ কাজটা করবে কিন্তু পরে কোন কারণে তা করতে পারল না। তাহলে তা ‘কসম ভঙ্গ’ হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ সে আল্লাহর নামে কসম করে নি। কিন্তু অবশ্যই তা ওয়াদার খেলাফ বা অঙ্গীকার ভঙ্গ করার  পর্যায়ে পড়বে, যা ক্ষেত্রবিশেষে কবিরা গুণাহর কারণ হয়ে পড়তে পারে । আর যদি ঐ ওয়াদা অন্য কারো সাথে হয়ে থাকে তবে তা  দ্বীন ভঙ্গের কারণ হয়ে দাড়ায়।  কারণ, মুমিনের একটি প্রধান গুণই হলো সে কখনো ওয়াদার খেলাফ করেনা, সে কখনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করেনা।  

২) পক্ষান্তরে কেউ যদি বলে, “আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, উমুক কাজটা করব।” তাহলে এটা হল কসম। এখন সে যদি উক্ত কাজটা না করে তাহলে তা ‘কসম ভঙ্গ’ হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে তাকে কসম ভঙ্গের কাফফারা দিতে হবে। কিন্তু সাধারণ ওয়াদা/অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে তার কোন কাফফারা নেই। কিন্তু ওয়াদা রক্ষা না করতে পারার কারণে আল্লাহর নিকট তওবা করবে এবং যার সাথে ওয়াদা করেছিল তার কাছে ক্ষমা চাইবে। আল্লাহু আলাম।

১) কিন্তু আপনি কারো সাথে যখন ওয়াদা করেন তখন সেইটার গুরুত্ব আবার  অন্যরকম। তা তখন অঙ্গীকার পর্যায়ে চলে যায়। 

অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা, রক্ষা মুমিনের অন্যতম গুণ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এ প্রসঙ্গে অনেক গুরুত্ব বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। অবশ্যই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৩৪)

অন্যত্র মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা অঙ্গীকারগুলো পূর্ণ করো। ’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১)

আরও ইরশাদ করেন, ‘আর আল্লাহর অঙ্গীকার পূরণ করো।

 (আল-আনআম, আয়াত: ১৫২)

অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘(বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরা এমন) যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না। ’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২০)

মহান আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার পর সে অঙ্গীকার পূর্ণ করো। ’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯১)।

অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হারাম ও মুনাফেকি
মহানবী (সা.) বলেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার মধ্যে ঈমান নেই। অনুরূপ যে ব্যক্তি অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার মধ্যে দ্বীন নেই। ’ (বায়হাকি, মিশকাত, পৃষ্ঠা : ১৫)

তিনি আরও ইরশাদ করেন, ‘মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখলে খিয়ানত করে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে চারটি। চতুর্থটি হলো যখন বিবাদ করে, গালাগাল করে। ’ (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত, ১৭ পৃষ্ঠা)

হাদিসের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়, অঙ্গীকার পূরণের সঙ্গে ঈমানের সম্পর্ক আছে। যার ঈমানের ঘাটতি রয়েছে, সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। আর এর ফলে আল্লাহ তাআলা শত্রুদের তাদের ওপর প্রবল ও শক্তিশালী করে দেন।  

আল্লাহ তাআলা তার বিরুদ্ধে বাদী হবেন...
হাদিসে কুদসিতে রয়েছে, ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি বিচার দিবসে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হবো। ১. যে ব্যক্তি অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করে, ২. যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করে এবং ৩. যে ব্যক্তি কোনো কর্মচারী নিয়োগ করে তার কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে, কিন্তু তার পারিশ্রমিক প্রদান করে না’ (সহিহ বুখারি)।

অঙ্গীকার ভঙ্গ করা কবিরা গুনাহ
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো নেতার আনুগত্যের অঙ্গীকার করে, তার উচিত সাধ্যমতো তার আনুগত্য করা (মুসলিম)। 

আবার,  কাউকে বৈধ কোনো কিছুর প্রতিশ্রুতি দিলে বা অঙ্গীকার করলে তা পূর্ণ করা আবশ্যক। বরং, আপনার ওয়াদা দেওয়ার কারণে এবং তা পূর্ণ না করার কারণে ঐ ব্যাক্তি  যদি কোন ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাহলে এর কাফফারা হলো, আপনি তওবা করার সাথে সাথে ঐ ব্যাক্তির ক্ষতিপূরণও দিয়ে দিবেন। 

মহান  আল্লাহ আমাদেরকে অংগীকার ও ওয়াদা সমূহ পূরণ করার  তাওফিক দান করুন। আমীন। 


২) 

কসম ভঙ্গ : 

কসম হচ্ছে, যে ওয়াদা বা অঙ্গীকার আল্লাহর নামে করা হয়। 

কোন ব্যক্তি যদি কোন কাজ করবে বলে আল্লাহর নামে কসম করে তারপর তা ভঙ্গ করে তাহলে তার জন্য কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব।

কসম ভঙ্গের কাফফারা হল:

– দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরণের খাবার খাবার খাওয়ানো।
– অথবা ১০ জন মিসকিনকে পোশাক দেয়া।
– অথবা একজন গোলাম আযাদ করা।
– এ তিনটি কোনটি সম্ভব না হলে তিনটি রোযা রাখা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّـهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَـٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ۚ ذَٰلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ ۚ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّـهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
“আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্যে; কিন্তু পাকড়াও করেন ঐ শপথের জন্যে যা তোমরা মজবুত করে বাধ। অতএব, এর কাফফরা এই যে, দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেনীর খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাক। অথবা, তাদেরকে বস্তু প্রদান করবে অথবা, একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দিবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফরা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা কর এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।” সূরা মায়িদাহ: ৮৯)

সুতরাং কেউ যদি আর্থিক সংকটের কারণে উপরোক্ত তিনটি জিনিসের কোনটি দ্বারা কসম ভঙ্গের কাফফারা আদায় করতে সক্ষম না হয় তাহলে তিনটি রোযা রাখবে।


জমহুর আলেমের অভিমত হচ্ছে– নগদ অর্থ দিয়ে কাফ্‌ফারা দিলে আদায় হবে না।

ইবনে কুদামা বলেন: কাফ্‌ফারা আদায় করার ক্ষেত্রে খাদ্য কিংবা বস্ত্রের মূল্য দিয়ে দিলে কাফ্‌ফারা আদায় হবে না। কেননা আল্লাহ্‌ খাদ্যের কথা উল্লেখ করেছেন সুতরাং অন্য কিছু দিয়ে কাফ্‌ফারা আদায় হবে না। কারণ আল্লাহ্‌ তাআলা তিনটি পদ্ধতি থেকে একটি চয়ন করার সুযোগ দিয়েছেন। যদি মূল্য দেয়া জায়েয হত তাহলে তিনটির মধ্যে সীমাবদ্ধ করার কোন অর্থ থাকে না।[ইবনে কুদামা এর আল-মুগনি (১১/২৫৬) থেকে সমাপ্ত]

শাইখ বিন বায (রহঃ) বলেন: কাফ্‌ফারা অবশ্যই খাদ্য হতে হবে; অর্থ নয়। কেননা কুরআন-সুন্নাহ্‌তে খাদ্যের কথাই এসেছে। আবশ্যকীয় পরিমাণ হচ্ছে– অর্ধ সা’ দেশীয় খাদ্যদ্রব্য; যেমন- খেজুর, গম ইত্যাদি। আধুনিক পরিমানের হিসাবে প্রায় দেড় কিলোগ্রাম। আর যদি আপনি তাদেরকে দুপুরের খাবার খাইয়ে দেন বা রাতের খাবার খাইয়ে দেন কিংবা পোশাক পরিয়ে দেয়, যে পোশাক দিয়ে নামায পড়া জায়েয হবে সেটাও যথেষ্ট। এমন পোশাক হচ্ছে– একটা জামা (জুব্বা) কিংবা একটা লুঙ্গি ও চাদর। [ফাতাওয়া ইসলামিয়া (৩/৪৮১)থেকে সমাপ্ত]

শাইখ উছাইমীন বলেন: যদি কেউ ক্রীতদাস না পায়, পোশাক বা খাবার দিতে না পারে তাহলে সে তিনদিন রোযা রাখবে। এ রোযাগুলো লাগাতরভাবে রাখতে হবে। মাঝে কোনদিন রোযা ভাঙ্গা যাবে না।[ফাতাওয়া মানারুল ইসলাম (৩/৬৬৭)

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।


৩) 

প্রশ্ন : অনেকবার আমার স্বামীকে বলেছি, এ রকম কথা আর তোমাকে বলব না। কিন্তু তারপরও বলে ফেলেছি। আবার বলেছি, আল্লাহ, এ রকম কাজ আর কোনোদিন করব না। তার পরও করা হয়েছে। এতে কি আমার ওয়াদা ভঙ্গ হয়েছে? ওয়াদা ভঙ্গ করলে তিনটা রোজা করে দিতে হয়। আমাকে কি রোজা করে দিতে হবে? আর তা করতে হলে কতগুলো রোজা করতে হবে?

উত্তর : এখানে বোন যে কারণে প্রশ্নটি করেছেন, সেটা হলো, তিনি অনেকবার ওয়াদা খেলাফ করেছেন। ওয়াদা খেলাফ করার বিষয়টি মূলত নৈতিক অবক্ষয় এবং জঘন্যতম অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসের মধ্যে বলেছেন, ‘আয়াতুল মুনাফেকে সালাস’ অর্থাৎ মুনাফেকের নিদর্শন হচ্ছে তিনটি। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ওয়াদা খেলাফ। মোনাফেক কোনো ওয়াদা করলে, তা খেলাফ করে। সুতরাং ওয়াদা খেলাফ করা কিন্তু জঘন্যতম অন্যায়-অপরাধ। এবং এটি মুনাফেকের লক্ষণ। সুতরাং আপনি বারবার একটি কাজ করবেন না বলছেন, আবার করছেন। এর অর্থ আপনি শুধুমাত্র মৌখিকভাবে এ ওয়াদাটুকু করছেন কিন্তু এর জন্য অন্তরের যে উপলব্ধি দরকার, সংকল্প দরকার, সেটি আপনার আসছে না। সুতরাং যতদিন পর্যন্ত সংকল্প না আসবে ততদিন পর্যন্ত আপনার এ ওয়াদাটুকু শুধুমাত্র একটি মৌখিক ওয়াদা। এর মাধ্যমে আপনি কার্যত কোনো ফল পাবেন না। এবং এর জন্য আপনি গুনাহগার হবেন। যেহেতু এ কাজের মাধ্যমে আপনি অন্যকে প্রতারিত করছেন এবং নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সুতরাং এটি গুনাহর কাজ সেটি খেয়াল রাখতে হবে। বাকি আপনি নিজেও একটি ফতোয়া দিয়েছেন, যে ফতোয়াটি আপনার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সেটা হচ্ছে, এর জন্য তিনদিনের সিয়াম পালন করা।

না। এ ধরনের ওয়াদা ভঙ্গ যদি কেউ করে থাকেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন। তার এই কাজটি কবিরা গুনাহ হবে, ওয়াদা খেলাফ করার কারণে। কিন্তু তার জন্য তিনদিনের রোজা রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ এটি কসম নয়। অর্থাৎ এটি কসমের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়নি।  

কসমের জন্য শর্ত হচ্ছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নামে যদি কেউ ওয়াদা করে থাকেন এবং সেটি যদি ভঙ্গ করেন, তাহলেই কেবল কসমের যে কাফফারা আছে, সেটি তিনি আদায় করবেন। তবে বোনের এ ওয়াদা কসম নয়, অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নামে তিনি ওয়াদা করেননি। কসম হতে হলে আল্লাহর নামে কসম করছেন বলে উল্লেখ করতে হবে। এ জন্য বোনকে সিয়াম পালন করতে হবে না। তবে অবশ্যই তওবা করার প্রয়োজন রয়েছে এবং নিজেকে সংশোধন করে এ কাজ থেকে ফিরে আসা দরকার, যেহেতু এটি বড় ধরনের ওয়াদা খেলাফের কাজ। 


৪) প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কেউ যদি কোন গর্হিত কাজের বা অন্যায় কাজের ওয়াদা করে বা কসম করে, প্রথমত এ ধরণের ওয়াদা বা কসম করাই অন্যায়, আর এর কাফফারা হচ্ছে, ঐ ওয়াদা বা কসম রক্ষা না করা। এবং এ ধরণের ওয়াদা যদি কারো সাথে করে থাকে তবে, তৎক্ষণাত তাকে জানিয়ে দিতে হবে, আমি এই ওয়াদা বা কসম অন্যায় ভাবে করেছি, তাই আমি এ ওয়াদা বা কসম রক্ষা করা থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করলাম। এবং এজন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমাও চাইতে হবে। 


মহান আল্লাহ আমাদেরকে ওয়াদা ও কসম এর ব্যাপারে যত্নবান হওয়ার তৌফিক দান করুন। 


প্রশ্ন: ৪০৫ : রক্ত নাপাক কিনা ।

 রক্ত কয়েক প্রকার যথা-

১। হায়েযের রক্ত: এটা সর্বসম্মতিক্রমে নাপাক। এটা নাপাক হওয়ার দলীল পূর্বে আলোচিত হয়েছে।

২। মানুষের রক্ত:[1] এটা পাক বা নাপাক হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ফিক্বহী মাযহাবের অনুসারীদের নিকট এ কথাই প্রসিদ্ধ যে, রক্ত অপবিত্র। এ ব্যাপারে তাদের কাছে কোন দলীল নেই। তবে কুরআনের আয়াত দ্বারা এটা (রক্ত) হারাম করা হয়েছে।

আল্লাহ্‌র বাণী:

﴿قُلْ لَا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَى طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنْزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ﴾

আপনি বলে দিন: যা কিছু বিধান ওহীর মাধ্যমে আমার কাছে পৌঁছেছে, তন্মধ্যে আমি কোন হারাম খাদ্য পাই না কোন ভক্ষণকারীর জন্যে, যা সে ভক্ষণ করে; কিন্তু মৃত অথবা প্রবাহিত রক্ত অথবা শুকরের গোশত ব্যতীত, নিশ্চয় তা অপবিত্র । (সূরা আল-আনআম :১৪৫)

রক্ত হারাম হওয়ার কারণে তা নাপাক হওয়াকেও আবশ্যক করে বলে তারা মনে করেন, যেমনটি তারা মদের ব্যাপারে মনে করে থাকেন। এর প্রকৃত ব্যাপারটি গোপন নয়। কিন্তু একাধিক বিদ্বানের বর্ণনা মতে, এটা (রক্ত) নাপাক হওয়ার উপর ইজমা হয়েছে। এ ব্যাপারে সামনে আলোচনা হবে।

অপরদিকে পরবর্তী মুজতাহিদগণ, তথা ইমাম শাওকানী, সিদ্দীক খান, আলবানী ও ইবনে উসাইমীন বলেন: (মানুষের) রক্ত পবিত্র। কেননা এ ব্যাপারে তাদের কাছে কোন ইজমা সাব্যাস্ত হয় নি। তারা নিম্নোক্তভাবে দলীল দিয়ে থাকেন।

(১) প্রত্যেক বস্ত্তই মূলতঃ পবিত্র; যতক্ষণ না তা নাপাক হওয়ার দলীল প্রতিষ্ঠিত হয়। মহানাবী (ﷺ) হায়েযের রক্ত ব্যতীত মানুষের শরীরের বিভিন্ন ক্ষত-বিক্ষত স্থান থেকে অধিক রক্ত ঝরার পরও তা ধৌত করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে আমাদের জানা নেই। যদি রক্ত নাপাক হতো, তাহলে মহানাবী (ﷺ) তার প্রয়োজনীয় বিধানের কথা অবশ্যই বর্ণনা করতেন।

(২) মুসলমানেরা তাদের ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় সালাত আদায় করতেন। অথচ তাদের শরীর থেকে এত রক্ত ঝরত যে তা সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। আর তা ধৌত করার নির্দেশ মহানাবী (ﷺ) এর পক্ষ থেকে কেউ বর্ণনা করেন নি এবং এটাও বর্ণিত হয় নি যে, তারা এ থেকে ব্যাপকভাবে সতর্ক থাকতেন।

হাসান বলেন: مَا زَالَ المُسْلِمُونَ يُصَلُّونَ فِي جِرَاحَاتِهِمْ অর্থাৎ:‘‘মুসলমানেরা সর্বদাই তাদের শরীর ক্ষত-বিক্ষত বা যখম থাকা অবস্থায় সালাত আদায় করতেন’’।[2]

আনসার সাহাবীর ব্যাপারে বর্ণিত হাদীস। যিনি রাতে সালাত আদায় করেছিলেন। এমতাবস্থায় এক মুশরিক তাকে একটি তীর নিক্ষেপ করল। ফলে তিনি আঘাত প্রাপ্ত হলেন, অতঃপর তিনি তা খুলে ফেললেন। এমনকি মুশরিক ব্যক্তি তাকে তিনটি তীর নিক্ষেপ করল। তারপর এ ভাবেই তিনি রুকু সাজদা করে, সমস্ত সালাত শেষ করলেন। আর তার শরীর দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল।[3]


আলবানী (রাহি.) বলেন,[4] এ হাদীসটি মারফূ হাদীসের হুকুমে। কেননা রাসূল (ﷺ) এ ব্যাপারে জানতেন না এমন ধারণা করা অনেক দূরের ব্যাপার। যদি অধিক রক্ত নাপাক হতো তাহলে মহানাবী (ﷺ) তা বর্ণনা করতেন। কেননা উসূল শাস্ত্রের নিয়ম হলো, কোন বিষয় প্রয়োজনের সময় ছাড়া পরে বর্ণনা করা বৈধ নয়। যদি ধরে নেয়া হয় যে, মহানাবী (ﷺ) এর কাছে এটা গোপন ছিল, তাহলে বলা হবে যে, আল্লাহ্‌র কাছে কিভাবে তা গোপন থাকতে পারে, যার কাছে আসমান জমিনের কোন কিছুই গোপন থাকে না। যদি রক্ত ওযূ ভঙ্গের কারণ হতো বা নাপাক হতো, তাহলে অবশ্যই মহানাবী (ﷺ) এর উপর তা ওহী করা হতো। এটা স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে। বিষয়টি অস্পষ্ট নয়।

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর শাহাদাতের ঘটনায় বর্ণিত হাদীস- صَلَّى عُمَرُ وَجُرْحُهُ يَثْعَبُ دَمًا অর্থাৎ: অতঃপর উমার (রাঃ) সালাত আদায় করলেন অথচ তাঁর যখম হতে তখন রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল।[5]

(৩) সা‘দ ইবনে মু’আয (রাঃ) এর মৃত্যুর ঘটনায় বর্ণিত আয়িশা (রা.) এর হাদীস। তিনি বলেন:

لَمَّا أُصِيبَ سَعْدُ بْنُ مُعَاذٍ يَوْمَ الْخَنْدَقِ، رَمَاهُ رَجُلٌ فِي الْأَكْحَلِ فَضَرَبَ عَلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ خَيْمَةً فِي الْمَسْجِدِ لِيَعُودَهُ مِنْ قَرِيبٍ (سنن أبي داود).......... فبينما هو ذات ليلة إذ تفجر كلمه فسال الدم من جرحه حتى دخل خباء إلى جنبه فقال الله أهل الخباء يا أهل الخباء ما هذا الذي يأتينا من قبلكم ؟ فنظروا فإذا سعد قد انفجر كلمه والدم له هدير فمات [ المعجم الكبير - الطبراني ]

অর্থাৎ: যখন সা‘দ ইব্ন মু‘আয (রাঃ) খন্দকের যুদ্ধে জনৈক ব্যক্তির তীরের আঘাতে আহত হয়েছিলেন, যা তার হাতের শিরায় বিদ্ধ হয়েছিল, তখন রাসুলুল­াহ (ﷺ) তার জন্য মাসজিদে (নাববীতে) একটা তাবু খাটিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি নিকট থেকে বার বার তার দেখাশুনা করতে পারেন।

অপর এক হাদীসে বলা হয়েছে, হঠাৎ এক রাতে তার যখমটি ফেটে গিয়ে রক্ত প্রবাহিত হলো, এমনকি তার পার্শ্ববর্তী তাবুতে রক্ত প্রবাহিত হলো, ফলে তাবুর মধ্যে যারা অবস্থান করছিলেন, তারা বললেন, হে তাবুবাসী তোমাদের তাবুতে এগুলো কি আসছে! এরপর তারা দেখল যে, সা‘দ (রাঃ) এর যখম ফেটে তিনি রক্তশূন্য হয়ে পড়েছেন। ফলে তিনি মারা যান।[6]

আমার বক্তব্য: মহানাবী (ﷺ) তার উপর পানি ঢেলে দেয়ার আদেশ দিয়েছিলেন এমনটি বর্ণিত হয় নি। অথচ তিনি মাসজিদে ছিলেন। যেমনটি তিনি জনৈক বেদুঈন লোকের পেশাব করার বেলায় তার উপর পানি ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

(৪) ইবনে রুশদ মাছের রক্তের ব্যাপারে আলিমদের মতভেদের কথা উল্লেখ করে বলেন: তাদের মতভেদের কারণ হল, মৃত মাছের ব্যাপারে। যারা মৃত মাছকে ‘মৃত প্রাণী বিশেষ হারাম’ এর আওতায় মনে করেন, তারা তার রক্তকেও অনুরূপ হারাম মনে করেন।

আর যারা মৃত মাছকে সার্বজনীন হারামের বহির্ভূত মনে করেন, তারা তার রক্তকেও মাছের উপর অনুমান বা কিয়াস করে হালাল মনে করেন।

উত্তরে আমরা বলব যে, তারা মৃত মানুষকে পবিত্র বলে থাকেন। তাহলে তাদের কায়দা অনুযায়ী মৃত মানুষের রক্তও পবিত্র!

এজন্য শেষভাগে ইবনে রুশদ বলেছেন, নাস বা দলীল শুধু হায়েযের রক্তকেই নাপাক বলে প্রমাণ করে। এটা ব্যতীত অন্য রক্ত তার মৌলিকতার উপর বহাল থাকবে। তথা তা পবিত্র। আর এ ব্যাপারটিতে সকল বিতর্ককারী ঐকমত্য পোষণ করেছেন। সুতরাং দলীলের উপযোগী নস বা প্রমাণাদী ছাড়া তা পবিত্রতার হুকুম থেকে বহির্ভূত করা যাবে না।


যদি বলা হয় মানুষের রক্তকে হায়েযের রক্তের সাথে কিয়াস বা অনুমান করা যায় কি না? আর হায়েযের রক্ততো নাপাক।

তাহলে উত্তরে আমরা বলব, এটা قياس مع الفارق (বিচ্ছিন্ন জিনিসের সঙ্গে কিয়াস) হয়ে গেল। হায়েযের রক্ত হলো, নারীদের প্রকৃতি বা জন্মগত স্বভাব। মহানাবী (ﷺ) বলেন: إِنَّ هَذَا شَيْءٌ كَتَبَهُ اللهُ عَلَى بَنَاتِ آدَمَ অর্থাৎ: এটা এমন একটা ব্যাপার যা আল্লাহ্‌ তা‘আলা সকল আদম-কন্যাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।[7]

মহানাবী (ﷺ) ইসেত্মহাযার ব্যাপারে বলেন: إنه دم عِرْق অর্থাৎ: এটা শিরা নির্গত রক্ত।[8] তদুপরি, হায়েযের রক্ত হয় গাঢ়, দুর্গন্ধময় এবং তা বিশ্রী গন্ধ করে। তা পেশাব পায়খানার মতই। এটা দুই রাস্তা ব্যতীত অন্য কোথাও থেকে নির্গত রক্ত নয়।


৩। যে প্রাণীর গোশত খাওয়া হয় তার রক্ত:

এ বিষয়ের আলোচনা মানুষের রক্তের ব্যাপারে পূর্বে যে আলোচনা করা হয়েছে তদ্রূপ। কেননা এটা নাপাক হওয়ার ব্যাপারে কোন দলীল নেই। সুতরাং তা মৌলিক দিক থেকে নাপাকী মুক্ত হওয়ার দাবীদার। নিম্নোক্ত বাণী দ্বারাও তা পবিত্র হওয়ার দলীলকে শক্তিশালী করে। যেমন ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, তিনি বলেন:

كَانَ يُصَلِّي عِنْدَ الْبَيْتِ وَأَبُو جَهْلٍ وَأَصْحَابٌ لَهُ جُلُوسٌ إِذْ قَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْض أيكم يقوم إلى جزور آل فلان فيعمد إلى فرثها ودمها وسلاها فيجيء به ثم يمهله حتى إذا سجد وضعه بين كتفيه فانبعث أشقاهم فلما سجد رسول الله عليه الصلاة والسلام وضعه بين كتفيه وثبت النبي عليه الصلاة والسلام ساجدا فضحكوا

একবার রাসুলুল্লাহ কা‘বা ঘরের নিকট দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় আবূ জাহল তার সাথীদের নিয়ে সেখানে বসে ছিল। অতঃপর তারা একে অপরে বলতে লাগল, তোমাদের এমন কে আছে যে অমুক গোত্রের উট যবেহ করার স্থান পর্যন্ত যেতে রাযী? সেখান থেকে গোবর, রক্ত ও গর্ভাশয় নিয়ে এসে অপেক্ষায় থাকবে। যখন এ ব্যক্তি সাজদায় যাবে, তখন এগুলো তার দুই কাঁধের মাঝখানে রেখে দেবে। এ কাজের জন্য তাদের চরম হতভাগা ব্যক্তি (‘উকবা) উঠে দাঁড়াল ( এবং তা নিয়ে আসলো)। যখন রাসুলুল্লাহ সাজদায় গেলেন তখন সে তার দু‘কাঁধের মাঝখানে সেগুলো রেখে দিল। নাবী সাজদায় স্থির হয়ে গেলেন। এতে তারা হাসাহাসি করতে লাগল.......।[9]

যদি উটের রক্ত নাপাক হতো, তাহলে মহানাবী (ﷺ) অবশ্য তার কাপড় খুলে ফেলতেন অথবা সালাত আদায় করা থেকে বিরত থাকতেন।

ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:

« أن ابن مسعود صلى وعلى بطنه فرث ودم من جزور نحرهاولم يتوضأ»

একদা ইবনে মাসউদ (রাঃ) সালাত আদায় করছিলেন। এমতাবস্থায় তার পেটের উপর উট যবেহ করা রক্ত ও গোবর বা অনুরূপ কিছু ছিল। অথচ তিনি এ জন্য ওযূ করেন নি।[10]

যদিও অত্র আসারটি প্রাণীর রক্ত পবিত্র হওয়ার ব্যাপারে দলীল হওয়ার ক্ষেত্রে বিতর্কিত। কেননা ইবনে মাসউদ সালাত বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য শরীর ও কাপড় পাক হওয়াকে শর্ত মনে করেন না। তিনি এটাকে মুস্তাহাব মনে করেন।

আমার বক্তব্য: যদি রক্ত নাপাক হওয়ার ব্যাপারে ইজমা সাব্যাস্ত হয়, তাহলে পরবর্তীদের দলীলের দিকে আমরা ভ্রূক্ষেপ করব না। আর যদি ইজমা সাব্যাস্ত না হয়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে রক্ত পবিত্র। এ সমস্ত দলীলাদীর প্রয়োজন নেই। যদিও আমার নিকট দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ রক্ত পবিত্র হওয়ার অভিমতটিই পছন্দনীয় ছিল। কিন্তু এখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে, এ মাসআলার ব্যাপারে ইজমা সাব্যাস্ত আছে। অনেক বিদ্বানই এর ইজমা হওয়ার কথাটি বর্ণনা করেছেন। এর বিপরীত প্রমাণিত হয় নি। এ ইজমার বর্ণনাগুলোর মধ্যে উচ্চমানের বর্ণনা হলো, ইমাম আহমাদ (রাহি.) এর বর্ণনা, অতঃপর ইবনে হাযম (রাহি.) এর বর্ণনা। (তবে যারা ধারণা করেন যে, আহমাদের মাযহাব হলো ‘রক্ত পবিত্র’ তাদের এ কথা সম্পূর্ণ বিপরীত।) এ ব্যাপারে আমি যতটুক জেনেছি তা হলো,

ইবনুল কাইয়্যিম ইগাসাতুল লুহফান গ্রন্থে (১/৪২০) বলেন: ইমাম আহমাদকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার দৃষ্টিতে কি রক্ত ও বমি সমান? উত্তরে তিনি বলেন: না, রক্তের ব্যাপারে কেউ মতভেদ করেন নি। তিনি পুনরায় বলেন: বমি, নাকের ময়লা ও পুঁজ আমার কাছে রক্তের চেয়ে শিথিল।

ইবনে হাযম মারাতিবুল ইজমা গ্রন্থে বলেন: আলিমগণ রক্ত নাজাসাত বা নাপাক হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

অনুরূপভাবে হাফেজ ফাতাহ গ্রন্থে (১/৪২০) এ ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করেছেন। ইবনু আব্দুল বার তামহীদ গ্রন্থে (২২/২৩০) বলেন: সব রক্তের হুকুম হায়েযের রক্তের হুকুমের মত। তবে অল্প রক্ত হলে তা উক্ত হুকুমের বহির্ভূত হবে তথা তা পবিত্র হবে। কেননা আল্লাহ্‌ তা‘আলা রক্ত নাপাক হওয়ার জন্য প্রবহমান হওয়াকে শর্ত করেছেন। আর যখন রক্ত প্রবহমান হবে তখন তা رجس তথা নাপাক হবে। এ ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা রয়েছে যে, প্রবহমান রক্ত رجس বা নাপাক। ইবনুল আরাবী আহকামুল কুরআনে (১/৭৯) বলেন: আলিমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, রক্ত হারাম এবং নাপাক। তা খাওয়া যায় না এবং এর মাধ্যমে উপকার গ্রহণও করা যায় না। আল্লাহ্‌ তা‘আলা এখানে রক্তকে মুত্বলাক বা সাধারণ ভাবে উল্লেখ করেছেন। আর সূরা আন‘আম এর মধ্যে তা مسفوح (প্রবহমান) শব্দের সাথে مقيد (নির্দিষ্ট) করেছেন। আলিমগণ এখানে সর্বসম্মতভাবে مطلق (সাধারণ) কে مقيد (নির্দিষ্ট) এর উপর ব্যবহার করেছেন।

ইমাম নাববী (রাহি:) মাজমু গ্রন্থে (২/৫৭৬) বলেন: দলীলসমূহ প্রকাশ্যভাবে রক্ত নাপাক হওয়ার উপর প্রমাণ বহন করে। মুসলমানদের মধ্যে কেউ এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন বলে আমার জানা নেই। তবে হাবী গ্রন্থকার কতিপয় উক্তিকারী থেকে বর্ণনা করে বলেন: রক্ত পবিত্র। কিন্তু এ সমস্ত উক্তিকারীগণকে ইজমা ও ইখতিলাফকারী আলিমদের মধ্যে গণ্য করা হয় না।

আমি বলি (আবূ মালিক): উপরের আলোচনা থেকে আমার কাছে যা স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো: ইজমা সাব্যাস্ত থাকার কারণে রক্ত অপবিত্র। তবে ইমাম আহমাদ (রাহি.) এর চেয়ে যদি আর কোন বড় মাপের ইমামের কাছ থেকে সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে রক্ত পবিত্র হওয়ার মতামতটি প্রাধান্য পাবে। আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।

[1] তাফসীরে কুরতুবী (২/২২১), মাজমূ (২/৫১১), মুহালস্না (১/১০২), কাফী (১/১১০), বিদায়াতুল মুজতাহীদ, সায়লুল জিরার (১/৩১), শারহুল মুমতে (১/৩৭৬), সিলসিলাতুছ সহীহাহ ও তামামুল মিন্নাহ পৃঃ ৫০।

[2] সনদ সহীহ, ইমাম বুখারী ময়ালস্নাক্ব সূত্রে বর্ণনা করেছেন ১/৩৩৬, ইবনে আবি শায়বা সহীহ সনদে মাওসূল সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যেমনটি ফাতহুল বারীতে বর্ণিত হয়েছে (১/৩৩৭)।

[3] সহীহ; ইমাম বুখারী মুয়ালস্নাক্ব সূত্রে বর্ণনা করেছেন ১/৩৩৬, অহমাদ মাওসূল সূত্রে বর্ণনা করেছেন, হাদীসটি সহীহ।

[4] তামামুল মিন্নাহ (৫১,৫২)

[5] সহীহ; মালিক (৮২), মালিক থেকে বাইহাকী বর্ণনা করেছেন (১/৩৫৭) ও অন্যান্যরা, এর সনদ সহীহ।

[6] সহীহ; আবুদাউদ মুখতাসারভাবে বর্ণনা করেছেন (৩১০০), তবারানী ফিল কাবীর (৬/৭)।

[7] বুখারী হা/ ২৯৪; মুসলিম হা/ ১২১১

[8] বুখারী হা/ ৩২৭; মুসলিম হা/ ৩৩৩

[9] বুখারী হা/ ২৪০; মুসলিম হা/ ১৭৯৪

[10] মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ১/২৫ পৃঃ; ইবনে আবী শায়বা ১/৩৯২

প্রশ্ন ৪০৪ : এস্তেঞ্জায় ঢিলা কুলুখ ও পানি ব্যবহার সংক্রান্ত ।

 

পেশাব করার পর ঢিলা বা টিস্যু ব্যবহার না করলে ব্যক্তি পবিত্র হয় না?

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ৤

আল্লাহ আপনাদের এই দ্বীনি খেদমতের প্রয়াসকে কবুল করুন৤

প্রশ্নকর্তা:মোহাম্মদ হানিফ

কাইচাবাড়ী, আশুলিয়া, ঢাকা

প্রশ্ন: আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব যিনি প্রস্রাব করার পর শুধু পানি ব্যবহার করেই উঠে যান৤ তাঁকে টিস্যু বা ঢিলা ব্যবহারের পর পানি ব্যবহারের কথা বললে তিনি বলেন এটি হচ্ছে এতমিনানের বিষয়৤ কথাটি কতটুকু যুক্তিযুক্ত৤ আমাদের নিজেদের ব্যাপারে তো দেখি কিছু সময় উঠা-বসা বা হাটাহাটি না করলে প্রস্রাব ঝরতে থাকে৤ প্রস্রাব থেকে পাক হওয়ার সঠিক পদ্ধতি কি এবং ঐ ইমামের পিছনে নামাজ পড়ার হুকুম কি? যথা শ্রীঘ্র উত্তরের আশায় রইলাম৤

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

ইমাম সাহেবের কথা ঠিকই আছে। পেশাব থেকে পবিত্র হওয়া আবশ্যক। এখন কারো পেশাব করে পানি ব্যবহার করা দ্বারাই সে পবিত্র হয়ে যায়। তার পেশাব ঝরে না। আবার কারো একটু বসে থাকলে, একটু দাড়ালে, নড়াচড়া করলে অবশিষ্ট পেশাব বের হয়। যার যেভাবে পবিত্র হয়, সে সেইভাবে পবিত্র হবে। পবিত্র হওয়াটা মাকসাদ। যেন কিছুতেই শরীরে পেশাবের ছিটা না পড়ে।

তো, কারো যদি পানি ব্যবহার করলেই চলে, তাহলে তাকে ঢিলা ব্যবহারে বাধ্য করার কোন মানে হয় না। বাকি যার ঝরতে থাকে, তার টিস্যু বা ঢিলা ব্যবহার করতে হবে। যেন পেশাবের ছিটা থেকে পবিত্র থাকা যায়।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَبْرَيْنِ، فَقَالَ: ” إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ، وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ، أَمَّا أَحَدُهُمَا: فَكَانَ لَا يَسْتَنْزِهُ مِنَ البَوْلِ – قَالَ وَكِيعٌ: مِنْ بَوْلِهِ – وَأَمَّا الْآخَرُ: فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ “.

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূল সাঃ দু’টি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম হচ্ছিলেন। বললেন, এ দু’টি কবরে আযাব হচ্ছে। কোন বড় কারণে আজাব হচ্ছে না। একজনের কবরে আজাব হচ্ছে সে পেশাব থেকে ভাল করে ইস্তিঞ্জা করতো না। আরেকজন চোগোলখুরী করতো। {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৯৮০, বুখারী, হাদীস নং-১৩৬১}

عَنْ عِيسَى بْنِ يَزْدَادَ الْيَمَانِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا بَالَ أَحَدُكُمْ فَلْيَنْتُرْ ذَكَرَهُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ»

হযরত ঈসাব বিন ইয়াযদাদ আলইয়ামানী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের কেউ পেশাব করে, তখন সে যেন তার লজ্জাস্থানকে তিনবার ঝেড়ে নেয় বা পবিত্র করে নেয়। {সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৩২৬}

وَمَنْ اسْتَجْمَرَ فَلْيُوتِرْ، مَنْ فَعَلَ فَقَدْ أَحْسَنَ، وَمَنْ لَا فَلَا حَرَجَ،

যে ব্যক্তি ঢিলা ব্যবহার করে সে যেন বেজোড় ব্যবহার করে। যে তা করবে সে উত্তম কাজ করল, আর যে করেনি তাতে কোন সমস্যা নেই। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৫}

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।


----------------------------------------------------------------------------

ইস্তিঞ্জা ও ঢিলা কুলুখের সুন্নতী তরীকাঃ

ইস্তিঞ্জা ও ঢিলা কুলুখের সুন্নতী তরীকা

আমার এই লেখাতে নারী ও পুরুষের সবার জন্যেই পেশাব ও পায়খানার পরে পবিত্রতা অর্জনের পদ্ধতি কি, সেটা বর্ণনা করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, নারী ও পুরুষের পবিত্রতা অর্জনের পদ্ধতি আলাদা। তাই অনেকে প্রশ্ন করেন, নারীদের পবিত্রতার পদ্ধতি কি? আসলে নারী ও পুরুষের, উভয়ের পবিত্রতা অর্জনের পদ্ধতি একই। সুতরাং, নিচে বর্ণিত এই নিয়ম অনুযায়ী নারী ও পুরুষ, সবাই পবিত্রতা অর্জন করতে পারবেন।

পেশাব-পায়খানার পরে নাপাকী দুইভাবে দূর করা যেতে পারেঃ

(১) পানি দ্বারা এবং (২) ঢিলা-কুলুখ অথবা টিস্যু দ্বারা।

পানি দ্বারা নাপাকী দূর করলে তার পূর্বে ঢিলা বা কুলুখ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এটা নারী ও পুরষ, উভয়ের জন্য। আমাদের দেশের অনেকে মনে করেন, পুরুষের পবিত্রতা অর্জনের জন্যে শুধুমাত্র পানি যথেষ্ঠ না, প্রথমে ঢিলা কুলুখ নিয়ে এরপরে পানি দিয়ে ধুইতে হবে। আসলে এটা একটা ভুল ধারণা। ঢিলা-কুলুখের নিয়ম নারী-পুরুষ সবার জন্যই এক। বরং, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়ে ‘কুবা’ মসজিদের কিছু মুসল্লী ঢিলা-কুলুখ না নিয়ে সরাসরি পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করতো। আর আল্লাহ তাআ’লা এই কাজটিকে পছন্দ করেছিলেন, এজন্য তাদের প্রশংসা করে কুরআনে আয়াতও নাযিল করা হয়েছিলো। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আ’নহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সেখানে এমন কিছু লোক আছে যারা নিজেদেরকে পূত-পবিত্র রাখতে পছন্দ করে।” সুরা তাওবাঃ ১০৮। এই আয়াতটি কুবাবাসী লোকদের উদ্দেশ্যে নাযিল করা হয়েছে। কারণ, তারা শুধুমাত্র পানি দ্বারা ইসতেঞ্জা করতো।” তিরমিযী, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ, হাদীস সহীহ।

পবিত্রতা অর্জনের জন্য পেশাব করার পরে তাড়াহুড়া করে উঠে না পড়ে, একটু সময় অপেক্ষা করতে হবে, যাতে করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, পেশাব আর বের হবেনা। তারপর পানি অথবা ঢিলা-কুলুখ, অথবা টিস্যু দিয়ে নাপাকী পরিষ্কার করতে হবে। শুধু পানি দিয়ে নাপাকী দূর করা উত্তম, সেইক্ষেত্রে আর ঢিলা-কুলুখ বা টিস্যু ব্যবহার করতে হবেনা। তবে নাপাকী দূর হয়েছে, এটা নিশ্চিত হলে পানি ব্যবহার না করে শুধু টিস্যু বা ঢিলা কুলুখ ব্যবহার করলেও পবিত্রতা অর্জন হবে। কিন্তু, এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা যাবেনা বা শয়তানের ওসওয়াসাকে অন্তরে স্থান দেওয়া যাবেনা। আপনি এটা নিয়ে দুঃশিচন্তা করে আপনার জীবন অতিষ্ট করে তুলবেন না আবার পেশাব থেকে বেঁচে থাকতে অসতর্কও হবেন না। আপনার যতটুকু সাধ্য আছে সে অনুযায়ী চেষ্টা করবেন নাপাকী থেকে মুক্ত থাকার জন্য। কিন্তু রোগের কারণে সেটা সম্ভব না হলে, আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো বোঝা চাপিয়ে দেন না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুলুখ ও পানি একত্রে ব্যবহার করেছেন, এ মর্মে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তিনি কখনো কেবল পানি ব্যবহার করেছেন। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ, মিশকাতঃ ৩৪২, ৩৬০ ‘টয়লেটের শিষ্টাচার’ অনুচ্ছেদ। কখনো তিনি বেজোড় সংখ্যক কুলুখ ব্যবহার করেছেন। সহীহ বুখারীঃ ১৫৫, ‘ওযু’ অধ্যায় ‘কুলুখ’ ব্যবহার অনুচ্ছেদ ২০। ওযু শেষে তিনি হালকা পানির ছিটা লজ্জাস্থান বরাবর ছিটিয়ে দিতেন। আহমাদ, আবু দাঊদ, মিশকাতঃ ৩৬১। এটি ছিল সন্দেহ দূর করার জন্য। এর চেয়ে বেশী কিছু করা বাড়াবাড়ি মাত্র। উল্লেখ্য, ঢিলা ব্যবহার করার পর পানি নেওয়ার যে বর্ণনা প্রচলিত আছে, তা একেবারেই ভিত্তিহীন কথা। ইরওয়াউল গালীলঃ ৪২; সিলসিলা যঈফাহঃ ১০৩১।

____________________________________

ইসলাম আমাদেরকে নির্লজ্জবেহায়া হতে শিক্ষা দেয়না

আমি যখন ছোটো ছিলাম তখন নামায পড়া আমার কাছে খুব কঠিন একটা কাজ মনে হতো। কারণ আমার উস্তাদেরা শিক্ষা দিতো, ছেলেদের পেশাব করার পরে লজ্জাস্থানে ঢিলা-কুলুখ ধরে ৪০ কদম হাটতে হবে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)! বিষয়টা শুনে ঘৃণায় আমার গা কেমন জানি রি রি করে উঠতো। আবার তারা বলতো এটা করা ওয়াজিব, না করলে পবিত্রতা অর্জন হবেনা, আর পবিত্রতা ছাড়া নামাযও হবেনা। তাই ১০ বছর বয়সে আমার উপরে নামায ফরয হওয়ার আগে থেকেই আমার দুঃশ্চিন্তা হতো, কিভাবে আমি এই (জঘন্য) অভ্যাসটা গড়ে তুলবো।  আমাদের দেশের প্রচলিত মসজিদগুলোর বাথরুমের পাশ দিয়ে গেলে ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়, না জানি কখন আপনি সভ্যতা বিরোধী এই নির্লজ্জ কাজের সম্মুখে পড়ে যান। অথচ, যে করছে সে দিব্যি এগুলো নেকীর কাজ মনে করে করে যাচ্ছে, কোনো বিকার নেই (লা হা’উলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ)! যাই হোক, আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ জানার সুযোগ করে দিয়েছেন। এই জঘন্য কাজ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনে একবারও করেন নি, এমনকি কোনো সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীদের কেউই করেন নি। এটা স্রেফ জাহেল (মূর্খ) মুসলমানের ফতোয়া।

আমাদের দেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠী দ্বীনের নামে এই নিকৃষ্ট বেদাতের সাথে জড়িত। আপনারা নিজে জানুন, শেয়ার করে অন্যদেরকে এই নোংরা বিদাতী স্বভাব থেকে সতর্ক করুন। এইরকম যত্ত নিকৃষ্ট শিরক ও বেদাত আমাদের দেশে প্রচলিত আছে, সেইগুলোর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বন্ধু, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাতের প্রচার প্রসারের জন্য কাজ করার তোওফিক দান করুন, আমিন।

____________________________________

 

লজ্জাস্থান ধরে রাস্তায় হাটাহাটি করা বেদাত

আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্যে, ইবাদতের নামে যেই কাজ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে করেন নি, তাঁর সাহাবীদেরকে করতে বলেননি অথবা, কোনো সাহাবী, তাবেয়ী বা তাবে তাবেয়ী করেননি, সেই কাজটা হলো বেদাত (দ্বীনের মাঝে নতুন আবিষ্কার)। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইস্তিঞ্জার পরে ৪০ কদম হাটেন নি, তাঁর সাহাবীদের এমনটা করতে বলেন নি, কোনো একজন সাহাবী এমনটা করেননি। এমনকি যেসমস্ত সাহাবীদের অসুস্থতার কারণে পেশাব ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তো, তারাও এইরকম বেহায়াপনা কাজ করেন নি।

সুতরাং, কেউ যদি বলে যেঃ পেশাবের পরে ৪০ কদম হাটতে হবে, হাঁটা ফরয/ওয়াজিব, তাহলে, এটা একটা বেদাত। ধর্মের নামে নতুন কোন কথা বা কাজ, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেন নি সেটাই হচ্ছে বেদাত। 

পেশাবের পরে লজ্জাস্থান ধরে ৪০ কদম হাঁটাহাঁটি করা দেখতে এতোটাই দৃষ্টিকটু, লজ্জা শরমের মাথা না খেয়ে কেউই এই নিকৃষ্ট বেদাতী কাজটা করতে পারবেনা। তারপরেও বেদাত করতে করতে যাদের ঘাড় ত্যাড়া হয়ে গেছ, তাদেরকে অনুরোধ করবো, দয়া করে বলবেন কুরআনের কোন আয়াতে, অথবা কোন হাদীসে অথবা কোন সাহাবী এই বেহায়াপনার কাজটা করেছেন, তাঁর দলীল-প্রমান দিন। যদি দলীল দিতে পারেন তাহলে, ইন শা’আল্লাহ, আমরা এই বেহায়াপনাকে মেনে নেবো। আর যদি দলিল দিতে না পারেন, তাহলে দ্বীনি ভাই হিসেবে অনুরোধ, এইসমস্ত বেহায়াপনা ও নোংরামি কাজ বাদ দিন।

____________________________________

পেশাব করার পর মনে হয় কয়েক ফোঁটা বের হয়েছে?

শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায রাহিমাহুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ একটি ফতোয়াঃ

প্রশ্নঃ জনৈক ব্যক্তি পেশাব শেষ করে পেশাবের স্থান ধৌত করে নেয়। কিন্তু যখনই সে নড়াচড়া করে ও দাঁড়ায়, তখন অনুভব হয় যে, কয়েক ফোঁটা পেশাব বের হয়েছে। এ জন্য সে দীর্ঘ সময় পেশাবের স্থানে বসে থাকে, আর বলে কি করব? সে কি তার এ অনুভূতি ও ধারণা ত্যাগ করে ওযু পূর্ণ করে নেবে? নাকি, পরিপূর্ণ পেশাব বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? আশা করি উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন। আল্লাহ আপনাদের কল্যাণ করুন।

উত্তরঃ আল-হামদুলিল্লাহ। এ বিষয়টি ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রনা) ও সন্দেহ থেকে সৃষ্টি হয়। আর এগুলো তৈরী হয় শয়তানের পক্ষ থেকে। তবে কারো কারো ব্যাপারে প্রকৃত পক্ষেই (অসুস্থতার কারণে) পেশাবের পরে দুয়েক ফোঁটা বের হয়।

কারো যদি সত্যিই এমন হয়, তাহলে সে তাড়াহুড়ো করবে না, বরং পেশাব বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, অতঃপর পানি দ্বারা পেশাবের স্থান ধৌত করবে। এরপর যদি কোন কিছুর আশঙ্কা থাকে, তাহলে লজ্জাস্থানের আশপাশে লুঙ্গি বা পায়জামায় পানি ছিটিয়ে দেবে। অতঃপর অযু শেষ করার পর যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, সেই দিকে সে কোন ভ্রুক্ষেপ করবে না। ওয়াসওয়াসা ত্যাগ করার জন্য এ পদ্ধতি তার জন্য সহায়ক হবে।

আর যদি শুধুই সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা হয়, যার কোন বাস্তবতা নেই, তবে তার প্রতি মোটেই ভ্রক্ষেপ করবে না। মুমিনদের জন্য এ সমস্ত জিনিসে দৃষ্টি না দেওয়া উচিত। কারণ, এগুলো শয়তানের ওয়াসওয়াসা। শয়তান চায় মানব জাতির সালাত-ইবাদত নষ্ট করতে। অতএব, তার ষড়যন্ত্র ও ওয়াসওয়াসা থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। আল্লাহকে আঁকড়ে থাকা এবং তার উপর ভরসা করা। আর এসব যা কিছু সৃষ্টি হয়, তা শয়তানের পক্ষ থেকে মনে করা, যাতে ওযু এবং তার পরবর্তী সালাতে এর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ সৃষ্টি না হয়। আর নিশ্চিতভাবে কিছু বের হলে, পুনরায় পবিত্র হবে ও অযূ করবে।

আর ধারণার কোনই গ্রহণ যোগ্যতা নেই। যদিও ৯৯% ভাগ ধারণা হয়, তার প্রতিও কোন ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না। এগুলো শয়তানের প্ররোচনা। যতক্ষণ পর্যন্ত দৃঢ় বিশ্বাস না হবে, সে তার অযূ, সালাত ও অন্যান্য কাজ করে যাবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হয়েছিলঃ হে আল্লাহর রাসূল, কোন ব্যক্তির ধারণা হয় যে, তার সালাতে কিছু বের হয়েছে। উত্তরে তিনি বলেন : (لَا يَنْصَرِفْ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا) সালাত ত্যাগ করবে না, যতক্ষণ না সে আওয়াজ শোনে, অথবা গন্ধ পায়। এখানে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, আওয়াজ বা গন্ধ না পাওয়া পর্যন্ত, কেবল ধারণার উপর নির্ভর করে সালাত ত্যাগ করবে না। তদ্রূপ মানুষ যখন অযূ থেকে ফারেগ হয়, অতঃপর কোন কিছু অনুভূত হলে, সে দিকে ভ্রুক্ষেপ করবে না, এবং তার প্রতি ফিরে যাবে না। বরং, সে তার পবিত্রতা, সালাত ও আমল করে যাবে, যতক্ষণ না ১০০% ভাগ ধারণা হয় যে, কিছু বের হয়েছে। কারণ, কিছু বের না হওয়াই নিয়ম। আরো স্মরণ রাখবে যে, শয়তানের ওয়াসওয়াসা, তার প্ররোচনা ও তার সৃষ্ট সন্দেহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুমিনকে ক্লান্ত করা ও তাকে কল্যাণকর এসব কাজ থেকে বিরত রাখা। আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাচ্ছি।

সূত্রঃ ফাতওয়া নূর আ’লা আদ-দারবঃ ২/৫৭৭।

____________________________________

পেশাব করার পরে যার সত্যি সত্যিই পেশাব বের হয় সে কি করবে

এই লেখাটা শায়খ মতিউর রাহমান মাদানী হা’ফিজাহুল্লাহর একটি প্রশ্নোত্তর থেকে নেওয়া। এবং তার সাথে আমি কিছুটা সম্পাদনা ও ব্যখ্যা যোগ করেছি।

(১) পেশাব শেষে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি চাপ দিবে, যাতে করে পেশাব পড়া বন্ধ হয়।

(২) এর পরেও যদি পেশাব বের হতে থাকে, তাহলে টিস্যু বা ঢিলা-কুলুখ নিয়ে পেশাব ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। (সাবধান! কোন হাটাহাটি নয়)। সে শুধু লজ্জাস্থান একটু ঝেড়ে পেশাব ফেলার চেষ্টা করবে, এবং এরপরে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলবে। এটা নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করার দরকার নেই। স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়াবাড়ি করে জীবনটাকে কষ্টকর করে তুলবেন না।

(৩) এর পরেও যদি মনে হয় পেশাব বের হচ্ছে, এটা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এই অবস্থায় সে পেশাব বের হচ্ছে কি না হচ্ছে, সেইদিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করবেনা। ওযু করার পরে সে কাপড়ের উপর দিয়ে লজ্জাস্থান বরাবর ও তার আশেপাশে সামান্য পানির ছিটা দিবে, এতে পেশাব বের হলো কিনা, এই ওয়াসওয়াসায় সে পড়বেনা। আর ওযু করার পরে বা নামাযে পেশাব বের হয়েছে এমন সন্দেহ হলে, একবার ‘আ’উযুবিল্লাহিমিনাশ শাইত্বানির রাযীম’ পড়বে। এরপরে এনিয়ে আর কোনো চিন্তা করবেনা, যদিওবা পেশাব বের হয়ে যায়! এই অবস্থায় সে মাযুর বা অসুস্থ, তাই তার জন্যে ওযু ভাংবেনা। অসুস্থতার কারণে সে এক ওযু দিয়েই এক ওয়াক্তের সমস্ত ফরয, সুন্নত, নফল নামায পড়তে পারবে।

(৪) আর কেউ যদি নিশ্চিত হয় যে, ওযু করার পরে, নামাযে বা এমনিতে যে কোনো সময় পেশাব পড়ে, তাহলে সে চিকিতসা করাবে কারণ এটা একটা রোগ। আর চিকিৎসা করেও উপকার না পেলে, সে লজ্জাস্থানে তুলা/কাপড় বা আন্ডারওয়ার পড়বে যাতে করে পেশাব গায়ে বা কাপড়ে না লাগে। যদি সম্ভব হয়, তাহলে প্রত্যেক নামাযের পূর্বে এটা পরিবর্তন করে নিবে। আর যদি এই পরিবর্তনকরার মাঝে কিছু পেশাব গায়ে বা কাপড়ে লাগে, অথবা পরিবর্তন করার কোন সুযোগ না থাকে, তাহলে ঐ অবস্থাতেই সেই নামায পড়ে নিবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই নামায ত্যাগ করা যাবেনা।

(৫) আর একটা মাসয়ালা হলো, এই রকম যাদের পেশাব পড়া রোগ, সে প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাযের আগে নতুন করে ওযু করে নিবে, কারণ তার জন্য এক ওযুতে দুই ওয়াক্তের নামায হবেনা। একবার ওযু করে শুধু এক ওয়াক্তের ফরয, সুন্নত, নফল সবগুলো নামায পড়তে পারবে। কিন্তু নতুন ওয়াক্তের নামাযের জন্য নতুন করে ওযু করে নিতে হবে।

সর্বশেষঃ উপরের লেখাগুলোতে আমি চেষ্টা করেছি এটা বুঝানোর জন্যে যে, এ ধরনের রোগের ক্ষেত্রে সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করতে হবে, নাপাকী থেকে মুক্ত থাকার জন্য। কিন্তু যেটা ক্ষমতার বাইরে থাকবে, বা যেটা করা খুব কষ্টকর হয়ে যাবে, সেই ব্যপারে আল্লাহ হচ্ছেন অত্যন্ত ক্ষমাশীল। কারণ, আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন, “আর আল্লাহ বান্দাদের জন্য সহজ করতে চান, তিনি কঠিন করতে চান না।”

“আল্লাহ সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা কারো উপর চাপিয়ে দেন না।”

লিখার দুর্বলতার কারণে হয়তোবা বোঝাতে পারলাম না। কারো যদি বুঝতে সমস্যা হয়, তাহলে আপনারা স্থানীয় কোন আলেমের সাথে কথা বলে বিস্তারিত জেনে নিতে পারেন ইন শা আল্লাহ। আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করুন, আমাদের দেহ ও মনকে পবিত্র রাখুন, আমিন।

প্রশ্ন: ৪০৩ : শুয়ে বা বসে নামাজ পড়ার বিধান।

 নামাজ আল্লাহর ফরজ বিধান। প্রতিটি মুমিনের ওপর সর্বাবস্থায় নামাজ আদায় আবশ্যক। কেউ যদি অসুস্থ হয়, তাহলেও তাকে নামাজ আদায় করতে হবে। তবে তখন নামাজ আদায়ের ধরনের ভিন্নতা আসবে। কিন্তু তার ওপর নামাজ রহিত হবে না। শুধু তিন ব্যক্তির ওপর নামাজ সাময়িক রহিত হয়; অপ্রাপ্তবয়স্ক, মানসিক ভারসাম্যহীন ও ঘুমন্ত ব্যক্তি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ো, যদি না পারো তবে বসে নামাজ পড়ো, যদি তা-ও না পারো তবে ইশারা করে নামাজ আদায় করো। ’ (বুখারি, হাদিস নং: ১০৫০)

এ হাদিস থেকে সহজেই বুঝে আসে যে, অসুস্থ অবস্থায়ও নামাজ ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নেই।

বরং নির্দিষ্ট নিয়মে বসে কিংবা ইশারা-ভঙ্গিতে নামাজ আদায় করতে হয়। নিম্নে অসুস্থ ব্যক্তির নামাজ আদায়ের নিয়ম-বিধান নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

• অসুস্থ ব্যক্তি নামাজের সব রুকন আদায় করতে অক্ষম হলে, যেসব রুকন আদায়ে সক্ষমতা রাখেন, সেগুলো আদায় করবেন।

• কেউ দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ে অক্ষম হলে, বসে বসে রুকু-সিজদা আদায় করে নামাজ আদায় করবেন। একইভাবে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলে, রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা হলে অথবা আরোগ্য হতে দেরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা হলে বসে নামাজ আদায় করার অনুমতি আছে।

আর যদি বসে রুকু-সিজদা করতেও অপারগ হয়, তাহলে সে বসে ইশারার মাধ্যমে রুকু-সিজদা করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৪৭, ১০৫০)

• যে ব্যক্তি ইশারায় রুকু-সিজদা করবে, সে রুকু থেকে সিজদাতে সামান্য বেশি ঝুঁকবে। অন্যথায় নামাজ সহিহ হবে না। (তিরমিজি, হাদিস নং: ৩৭৬)

• সিজদা করার জন্য কোনো বস্তুর ওপর বা সেটি ওপরে তুলে সেটাতে মাথা ঠেকিয়ে সিজদা করার প্রয়োজন নেই। (সুনানে কুবরা, হাদিস নং: ৩৮১৯, ইবনে আবি শায়বা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৭৩)

• অসুস্থতার কারণে বসে নামাজ পড়তে অপারগ হলে, শুয়ে ইশারার মাধ্যমে নামাজ পড়বেন। তখন অসুস্থ ব্যক্তির পা কিবলার দিকে করে শোয়াতে হবে। তবে মাথাকে সামান্য ওপরে তুলে শোয়র ব্যবস্থা করতে হবে, যেন চেহারা কিবলার দিকে হয়। এরপর ইশারা করে রুকু-সিজদা করবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৭৩)

• শুধুমাত্র মাথা দিয়ে ইশারা করলেও তা রুকু-সিজদার স্থলাভিষিক্ত বলে বিবেচিত হবে। ইশারা কেবল চোখ বা অন্তরে করলে নামাজ শুদ্ধ হবে না। (সুনানে কুবরা, হাদিস নং: ৩৭১৯)

• অসুস্থ ব্যক্তি মাথার মাধ্যমে ইশারা করতে অক্ষম হলে, তার অবস্থা বিবেচনা করা হবে। তখন দেখতে হবে, এভাবে তিনি কতক্ষণ থাকেন। পাঁচ ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর যদি অবস্থার উন্নতি ঘটে, তাহলে ওই সব নামাজ মাথা দিয়ে ইশারা করে কাজা করে নেবে। আর যদি এর চেয়ে বেশি সময় পার হওয়ার পরও উন্নতি না হয়, তবে ওই সব নামাজ তার দায়িত্বে আর থাকবে না। অর্থাৎ এগুলো আদায় করা লাগবে না। (মুআত্তা মুহাম্মদ, হাদিস নং: ২৭৮, দারা কুতনি, হাদিস নং: ১৮৮৩)

প্রশ্ন: ৪০২ : গণতন্ত্রের ব্যাপারে ইসলাম কী বলে ? অর্থাৎ, গণতন্ত্রের ধারণা ইসলামে কি রকম ?

 ঢালাও গণতন্ত্র নয়, বরং ইসলামে রয়েছে নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র। যেমন: রাষ্ট্র প্রধান আপনি নির্বাচিত করতে পারবেন। কিন্তু যাকে খুশি তাকেই নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে আলেমদের একটি সর্বোচ্চ প্যানেল থাকবে, সেখানে উচ্চ পর্যায়ের আলেমগণ থাকবেন, তারা রাস্ট্রের নাগরিকদের মধ্য থেকে কারা আসলে ইসলাী রাস্ট্রের রাস্ট্রপ্রধান হওয়ার যোাগ্যতা রাখে সেই ধরণের যোগ্যতা সম্পন্ন পাচ জন্য ব্যাক্তিকে সিলেক্ট করে দিবেন। তারাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এবং তখন আপনি এই পাচজনের যে কোন একজনকে মনোনীত করতে পারবেন। অর্থাৎ, ইসলামী গণতন্ত্র শুধু ঐটুকুই, যা শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে - যে টুকু পসন্দ করার অধিকার আপনার আছে - শুধু ঐ টুকুতেই গণতন্ত্র। কিন্তু ৫১% তো দুরের কথা, বরং দেশের ১০০% জনগণও যদি, শরীয়তের মধ্যে নেই এমন কোন বিষয়ে একমত হয়ে যায়, অথবা, এমন কোন বিষয় দাবী করে যা শরীয়তে নেই, তবে ইসলামী গণতন্ত্রে তা বাতিল। অর্থাৎ, ইসলামী গণতন্ত্র হলো ইসলামের মধ্যে থেকে কোন বিষয়ে অল্টারনেটিভ তালাশ করার কোন সুযোগ যদি আপনার থেকে থাকে শুধুমাত্র সেটুকু ক্ষেত্রেই অল্টারনেটিভ নির্বাচন করার অধিকার আপনার রয়েছে। এটাই ইসলামী গণতন্ত্র।

প্রশ্ন: ৪০১ : অজুর ফরজ, সুন্নাত ও মুস্তাহাব সমূহ ।

 অজুর ফরজ চারটি।

১. মাথার চুলের গোড়া থেকে থুতনীর নিচ পর্যন্ত এবং এক কানের লতি থেকে অন্য কানের লতি পর্যন্ত সমস্ত মুখ ধৌত করা।

২. উভয় হাত কনুইসহ ধৌত করা।

৩. মাথার চার ভাগের একভাগ মাসেহ করা।

৪. উভয় পা টাখনু -গিরাসহ ধৌত করা।

দাড়ি ঘন হলে তার গোড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছানো জরুরী নয়।

যদি এসব অঙ্গের কোন একটির নখ পরিমাণও শুকনা থাকে,তাহলে অজু শুদ্ধ হবেনা।

ইমাম আহমদ ও ইমাম শাফেই (রহ.) এর মতে নিয়ত করা এবং অজুর ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও ফরজ।

আর ইমাম মালেক (রহ.) এর মতে একের পর এক অর্থাৎ এক অঙ্গ শুকাতে না শুকাতে আরেক অঙ্গ ধোয়াও ফরজ।

ইমাম আহমদ (রহ.) এর মতে বিসমিল্লাহ বলা,কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়াও ফরজ। ইমাম মালেক ও আহমদ (রহ.) এর মতে সমস্ত মাথা মাসেহ করা ফরজ।


মালাবুদ্দা-মিনহু ৩০


-------------------------------------------------------------------------------------------

অযুর সুন্নতসমূহ: অযুর মধ্যে ১৮টি সুন্নত রয়েছে। 


এ সুন্নতসমূহ আদায় করলে উত্তম এবং পরিপূর্ণরূপে অযু আদায় হয়। 

অযুতে নিয়্যত করা সুন্নত। যথা- এমন নিয়্যত করা যে, আমি নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য অযু করছি। [সুনানুন নাসায়ী, ১/২৪]। 

বিছ্মিল্লাহির রহমানির রহীম পড়া সুন্নত। কোন কোন রেওয়ায়েতে নিচের দোয়াটি পড়ার কথা আছে, বিছ্মিল্লা-হিল ‘আযীম ওয়ালহামদু লিল্লা-হি ‘আলা-দীনিল্ ইসলাম। অন্য রেওয়ায়েতে বিছ্মিল্লা-হি ওয়ালহামদু লিল্লা-হ পড়ার কথা বলা হয়েছে। অযু করার সময় নিচের দোয়াটিও পড়া যায়: আল্লা-হুম্মার্গ্ফি লী যাম্বী, ওয়াওয়াচ্ছি’ লী ফী দা-রী, ওয়া বারিক্ লী ফী রিয্ক্বী। [হাশিয়াতুত তাহাবী আলা মারাকিয়িল ফালাহ, ১/১০৫, মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ১/৫১৩]। 

দুই হাতের কব্জিসহ তিনবার করে ধোয়া সুন্নত। [সুনানে আবু দাউদ, ১/১৫]। 

মিসওয়াক করা সুন্নত। মিসওয়াক না থাকলে আঙ্গুলের সাহায্যে দাঁত পরিস্কার করা। [হাশিয়াতুত তাহাবী আলা মারাকিয়িল ফালাহ, ১/১০৫-১০৬]। 

তিনবার কুলি করা সুন্নত। রোযাদার না হলে কলকলার সাথে কুলি করা [আবু দাউদ, ১/১৯/১৪]।

 তিনবার নাকে পানি দেওয়া সুন্নত। নাক ভালোভাবে ঝেড়ে পরিস্কার করা ভাল। [সুনানে আবু দাউদ, ১/১৫]।

 সমস্ত মুখ তিনবার ধোয়া সুন্নত। প্রত্যেক অঙ্গকে তিনবার করে ধোয়া সুন্নত। মুখমন্ডল ধোয়ার সময় দাড়ি ভালোভাবে খিলাল করা। [আবু দাউদ, ১/১৯, সহীহ আল-বুখারী, ১/২৭-২৮]। ফায়দা: দাড়ি খিলাল করার সুন্নত পদ্ধতি হচ্ছে, তিনবার মুখমন্ডল ধোয়ার পর হাতের তালুতে পানি নিয়ে চিবুকের পাশে মুখ গহŸরের নিম্মাংশে পানি দেবেন, তারপর দাড়ি খিলাল করবেন।

 ডান হাতের কনুইসহ তিনবার ধোয়া সুন্নত। বাম হাতের কনুইসহ তিনবার ধোয়া সুন্নত। দুই হাতের আঙ্গুলী খিলাল করা সুন্নত। [আবু দাউদ, ১/১৯। 

সমস্ত মাথা একবার মাসেহ করা সুন্নত। [ফতওয়ায়ে শামী, ১/২৪৩]। 

কান মাসেহ করা সুন্নত। [সুনানুন নাসায়ী, ১/২৯]। গর্দান মাসেহ করা মুস্তাহাব। 

গলা মাসেহ করা বিদআত। [হাশিয়াতুত তাহাবী আলা মারাকিয়িল ফালাহ, ১/১১৫, ১/১১২]। 

ডান পায়ের টাখনুসহ তিনবার ধোয়া সুন্নত। 

বাম পায়ের টাখনুসহ তিনবার ধোয়া সুন্নত। 

দুই  পায়ের আঙ্গুলী খিলাল করা সুন্নাত। 

এক অঙ্গ শুকানোর পূর্বে অন্য অঙ্গ ধোয়া। [হাশিয়াতুত তাহাবী আলা মারাকিয়িল ফালাহ, ১/১১৩]। 

ধারাবাহিকভাবে অযু করা সুন্নত। অর্থাৎ যেটার পর যে অঙ্গ ধুইতে হবে সেটাই ধোয়া। আগে পরে না করা। [মারাকিয়িল ফালাহ, ১/১১২]। 

ডান পাশের অঙ্গ আগে ধোয়া। [সহীহ আল-বুখারী, ১/২৯]। 

মাথার অগ্রভাগ থেকে মাসেহ শুরু করা। [সহীহ আল-বুখারী, ১/৩১]।

 অযু শেষ হওয়ার পর কালিমায়ে শাহাদাত পড়বেন- আশ্হাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহূ লা-শারীকা লাহূ ওয়া আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আবদুহ‚ ওয়া রাসূলুহ‚।



------------------------------------------------------------------------------------

অযুর ২৯টি মুস্তাহাব

❁   কিবলামুখী   হওয়া,   

❁   উঁচু   জায়গায় ,

❁ বসা,   

❁ পানি প্রবাহিত করার সময় অঙ্গসমূহের উপর  হাত     বুলানো,   

❁    শান্তভাবে  অযু  করা,

❁অযুর    অঙ্গ  সমূহ প্রথমে পানি   দিয়ে ভিজিয়ে নেয়া,    বিশেষ   করে    শীতের   সময়ে,   

❁    অযু করার  সময়  প্রয়োজন ছাড়া  কারো সাহায্য না নেয়া,

❁  ডান  হাতে কুলি করা,

❁  ডান হাতে নাকে   পানি   দেয়া,   

❁   বাম   হাত     দ্বারা   নাক   পরিস্কার করা,

❁ বামহাতের কনিষ্টাঙ্গুলী নাকে প্রবেশ  করানো।  

❁আঙ্গুল   সমূহের   পিঠ     দ্বারা ঘাঁড় মাসেহ্ করা,

❁ কান মাসেহ্ করার সময় হাতের ভিজা কনিষ্ঠাঙ্গুলী   কানের ছিদ্রে    প্রবেশ করানো, 

❁আংটি    নাড়া দেওয়া,  যখন আংটি ঢিলা   হয়    এবং  আংটির   নিচে    পানি  পৌঁছেছে বলে     প্রবল     ধারণা     হয়,     আর      যদি       আংটি আঙ্গুলের সাথে   দৃঢ়ভাবে  সংযুক্ত  থাকে তাহলে আংটি নেড়ে  এর নিচে পানি পৌঁছানো  ফরয। 

❁     শরয়ী     মাযুর      (অক্ষম      ব্যক্তি)     না     হলে নামাযের  সময়   শুরু  হওয়ার  পূর্বেই  অযু   করা। 

❁  যারা  পরিপূর্ণভাবে  অযু করে অর্থাৎ যাদের  কোন অঙ্গই   পানি প্রবাহিত  না  হয়ে  থাকে  না  তাদের জন্য  নাকের  দিকস্থ  চোখের উভয় কোণা, টাখনু, গোড়ালি, পায়ের তালু,   গোড়ালীর   উপরের   মোটা রগ,  আঙ্গুল সমূহের      মাঝখানের      ফাঁকা      জায়গা,      কনুই  ইত্যাদি   অঙ্গ  সমূহের   প্রতি    বিশেষভাবে লক্ষ্য  রাখা মুস্তাহাব, যাতে উক্ত অঙ্গ সমূহ শুষ্ক থেকে না  যায়।  আর  যারা   খামখেয়ালী  তাদের   জন্য অযুর         সময়         উক্ত          জায়গাগুলোর          প্রতি  বিশেষভাবে       খেয়াল      রাখা     ফরয।     কেননা, অধিকাংশের    ক্ষেত্রে     উক্ত   জায়গাগুলো   ধৌত করার   পরও শুষ্ক থেকে  যেতে দেখা   গিয়েছে। আর এটা     খামখেয়ালিপনারই     কারণে     হয়ে  থাকে।    এরূপ     খামখেয়ালিপনা     হারাম    এবং বিশেষভাবে খেয়াল রাখা ফরয যাতে কোন অঙ্গ শুষ্ক থেকে না যায়।

❁অযুর লোটা (বদনা) বাম দিকে   রাখুন।   যদি    বড়     গামলা   বা     পাতিল  ইত্যাদি   থেকে   অযু  করে, তাহলে  ডান    পাশে রাখুন।

❁মুখমন্ডল      ধোয়ার     সময়       কপালের উপর    এমনভাবে   পানি    দেয়া    যেন   কপালের  উপরের  কিছু অংশও  ধুয়ে  যায়।

❁  মুখমন্ডল,  

❁হাত   ও    পায়ের  উজ্জলতা    বৃদ্ধি  করা  অর্থাৎ যতটুকু জায়গা ধৌত করা ফরয তার চতুর্দিকের কিছু কিছু  অংশ  বাড়িয়ে   ধৌত   করা।  যেমন- হাত  ধোয়ার    সময়   কনুইর উপর বাহুর অর্ধেক পর্যন্ত ও পা ধোয়ার সময় টাখনুর  উপর গোছার অর্ধেক পর্যন্ত ধৌত করা।

❁দুই হাতে মুখমন্ডল ধৌত করা।

❁হাত  ও পা ধোয়ার  সময় আঙ্গুল সমূহ  থেকে   ধোয়া  শুরু   করা।  

❁প্রত্যেক   অঙ্গ ধোয়ার    পর   হাত   বুলিয়ে    অঙ্গ    থেকে   পানির ফোঁটাগুলো    ফেলে    দেয়া,   যেন   শরীর অথবা  কাপড়ের     উপর     ফোঁটা     ফোঁটা     না       ঝরে।   বিশেষত:    মসজিদে    যাওয়ার   সময়।   কেননা,  মসজিদের   ফ্লোরে   অযুর   পানির   ফোঁটা   ফেলা  মাকরূহে     তাহরীমী।

❁     প্রত্যেক     অঙ্গ     ধৌত  করার সময়  ও মাথা  মাসেহ করার সময়  অযুর  নিয়্যত   কার্যকর  রাখা।

❁অযুর শুরুতে  بِسْمِ   الله পাঠ     করার      সাথে     সাথে      দরূদ     শরীফ      ও কলেমায়ে     শাহাদাত      পাঠ      করা।     

❁     বিনা প্রয়োজনে    অযুর   অঙ্গ     সমূহ   না   মোছা,     যদি  নিতান্তই  মুছতে  হয়  তাহলে  সম্পূর্ণ  না শুকিয়ে  সামান্য    আদ্র    (ভিজা)    অবস্থায়    রেখে    দেয়া।  কেননা,   কিয়ামতের  দিন  নেকীর  পাল্লায় রাখা হবে।

❁ অযুর পর হাত না ঝাড়া, কারণ  এটা শয়তানের   জন্য   পাখায়   পরিণত  হয়,  

❁পানি ছিটানোর      সময়     পায়জামার      উক্ত       অংশকে জামার প্রান্ত বা আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখা উচিত। অযুর  সময়  এমন  কি সবসময় পায়জামার উক্ত অংশ     জামার    আচল   বা    চাদর   ইত্যাদি   দ্বারা ঢেকে রাখা উত্তম। যাতে ভেসে উঠা সতর দেখা না যায়।

❁ যদি   মাকরূহ সময়  না হয়  তাহলে অযুর   পর  দু’রাকাত নফল নামায আদায় করা, যাকে তাহিয়্যাতুল      অযু    বলা     হয়।    (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ২৯৩-৩০০ পৃষ্ঠা)

Featured Post

প্রশ্নোত্তর পর্বসমূহ

আস সালামু আলাইকুম । আপনারা তাফহীমুল কুরআন এ্যাপের মাধ্যমে যে প্রশ্নগুলো করেছেন এখানে সেগুলোর উত্তর তালিকা আকারে দেওয়া হয়েছে।  বিগত দিনের ...